জড়িত ৭ ব্যাংক ও কিছু মানি এক্সচেঞ্জ

শাহজালাল থেকেই প্রতিদিন পাচার হচ্ছে শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা

প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধভাবে সংগ্রহ করে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করছে একটি চক্র। ব্যাংককে বসেই অবৈধভাবে বিদেশি মুদ্রা ক্রয় বিক্রয় ও মানিলন্ডারিং করছে চক্রটি। এ কাজের সঙ্গে সরাসরি সরকারি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারাও জড়িত। চক্রটি প্রতিদিন শত কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা লোপাট ও বিদেশে পাচার করছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির সচিব মো. মাহবুব হোসেন।
তিনি বলেন, অনিয়মে জড়িত বিভিন্ন ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা ও কিছু মানি এক্সচেঞ্জারের কারণে প্রতিদিন শত কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে ব্যাংকিং খাত বঞ্চিত হচ্ছে। সন্দেহভাজন ও জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তারা দুদকের নজরদারিতে রয়েছেন। তাদের মদদদাতা ও সহযোগীদের বিষয়েও কমিশনের নির্দেশে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কমিশন আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তিনি বলেন, সোমবার এয়ারপোর্টে দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে এ চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রবাসী শ্রমিকরা হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে যে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করেন তা ব্যাংকিং চ্যানেলে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু অসাধু ব্যাংকাররা ব্যাংকের টাকা ব্যবহার করে তা ব্যাংকিং চ্যানেলে সংগৃহীত না দেখিয়ে নিজেরাই ক্রয়পূর্বক মার্কেটে বিক্রি করে দেন, যা পরবর্তীতে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে আবার বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এভাবে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।
দুদক সচিব বলেন, গোয়েন্দা সূত্রে তথ্য পেয়ে এবং সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপ-পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম এ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে বিদেশি মুদ্রার কালোবাজারি সঙ্গে জড়িত ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জারদের একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়।
দুদক সূত্রে আরও জানা যায়, সাধারণত প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী এবং বিদেশি ভ্রমণকারী বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে আসেন। তারা তাদের সঙ্গে আনা বিদেশি মুদ্রা বিমানবন্দরে থাকা ব্যাংকের বুথ ও মানি এক্সচেঞ্জারে দেশীয় মুদ্রা বা বাংলাদেশি টাকায় এনকেশমেন্ট করে থাকেন। আইন, বিধি অনুযায়ী ফরেন কারেন্সি এনকেশমেন্ট ভাউচার এনকেশমেন্টকারীকে দিতে হয়। কিন্তু ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জাররা ভাউচার না দিয়ে বা জাল ভাউচার দিয়ে সরাসরি কিনে নেন। তার বিনিময়ে টাকা দিয়ে দেয়।
এছাড়াও তারা স্বাক্ষরবিহীন, ভুয়া ভাউচার বা এনকেশমেন্ট স্লিপ প্রদান করে। এই বিদেশি মুদ্রার ক্রয়কারী ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের মূল হিসাবে বা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত অ্যাকাউন্টে অন্তর্ভুক্ত করেন না। ফলে বিদেশি মুদ্রার কেন্দ্রীয় রিজার্ভে যুক্ত হয় না। এ কারণে দেশে বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি বা সংকটের সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে দুদক সচিব আরও বলেন, দুদকের অভিযানে বিমানবন্দরে অবৈধভাবে বিদেশি মুদ্রা ক্রয় বিক্রয়ে ও মানিলন্ডারিংয়ে জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং কিছু মানি এক্সচেঞ্জার প্রতিষ্ঠান, যেমন- এভিয়া মানিএক্সচেঞ্জার ও ইম্পেরিয়াল মানি এক্সচেঞ্জারের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, এই অনিয়মের ফলের প্রতিদিন শত কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে ব্যাংকিং খাত বঞ্চিত হচ্ছে। অপরাধে জড়িতরা অবৈধভাবে ক্রয়কৃত ডলার, ইউরো, রিয়াল, রিঙ্গিত, পাউন্ড, দিনারসহ অন্যান্য ফরেন কারেন্সি সংগ্রহপূর্বক বিদেশি মুদ্রা পাচারকারী, বিদেশি মুদ্রার কালোবাজারি ও বাংলাদেশ থেকে বিদেশে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারকারী দুর্নীতিবাজদের অবৈধভাবে সরবরাহ করেন বলে দুদকের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য রয়েছে।
দুদক সচিব বলেন, দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযানকালে ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জার কর্তৃক এনকেশমেন্ট স্লিপ ব্যতীত ফরেন কারেন্সি ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ, একাধিক ভুয়া ও স্বাক্ষরবিহীন ভাউচার সংগ্রহ করেছে। এছাড়া এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছে দুদকের টিম।

বিজ্ঞাপন