সামাজিক বৈষম্যের শিকার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তরুণ ও শিশুরা

এখনো ডায়াবেটিস বলতে বড়দের অসুখই মনে করা হয় বাংলাদেশের সমাজে। তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সীরাই। তরুণ এবং শিশুরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা নিতে আগ্রহ পাচ্ছেন না। বরং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে লুকিয়ে রাখছেন।
২২ বছর বয়সী রবিউল হক এখনো ছাত্রাবাসে থাকেন একদিন ইনসুলিন নিতে দেখে ছাত্রাবাসের কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন যে, রবিউল অবৈধ কোনো মাদকদ্রব্য নিচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে তাকে পুলিশে দেয় তারা। অথচ রবিউল সেদিন কোনো মাদক নয়, বরং নিচ্ছিলো জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিন।
মাত্র নয় বছর বয়সেই রবিউলের ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। তখন থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি বাড়িতেও বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কিন্তু থেমে থাকেনি রবিউল। সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই সে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। স্কুল-কলেজ পেরিয়ে এক সময় উচ্চতর ডিগ্রি নেয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। তবু ডায়াবেটিস নিয়ে সামাজিক নানান কু-সংস্কার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসাব মতে, বাংলাদেশে ১৭ হাজার শিশু ডায়াবেটিসে ভুগছে। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত আর ২০ শতাংশ টাইপ-২ এ। দেশে প্রতি বছর প্রতি এক লাখ শিশু-কিশোরের মধ্যে টাইপ-১ ডায়াবেটিস আক্রান্তের ঘটনার সংখ্যা ৩ দশমিক ৪টি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটদের যে ডায়াবেটিস হয়, তা বড়দের থেকে ভিন্ন। শিশুদের হয় টাইপ-১ ডায়াবেটিস। আর বড়দের হয় টাইপ-২ ডায়াবেটিস। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শিশুদের শরীরে রক্তকে নিয়ন্ত্রণ করে ‘ইনসুলিন’ নামক যে হরমোন, সেটা তৈরি হয় না। তাই ইনসুলিন ছাড়া এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসও বাড়ছে। টাইপ-২ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস কেন হচ্ছে, এর সঠিক কোনো কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় হয়নি।
সামিয়া ইসলাম (২৫) রবিউলের মতো, সামাজিক কু-সংস্কার ও বৈষম্যের শিকার। ২০১০ সালে কলেজে পড়া অবস্থায় তার টাইপ-১ ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। এরপর বাবা-মা তাকে বেশিরভাগ সময়েই অন্যদের কাছ থেকে দূরে দূরে রাখতেন। এমনকি তাকে টিকাও নিতে হতো গোপনে।
বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদেরও ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও আমরা বড়দের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া দেখে অভ্যস্ত। ফলে শিশুদের ডায়াবেটিস হওয়া বিষয়ে এখনো তেমন সচেতনতা গড়ে উঠেনি। ফলে ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদেরকে রোগের পাশাপাশি সামাজিক কু-সংস্কারের বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। যদিও এর প্রকৃত কারণ এখনো নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। টাইপ-১ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা নিরাময়যোগ্য নয়। এই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে রোগীর দেহে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না। এ কারণে হরমোনটি নিয়মিত শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করাতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সামাজিক কুসংস্কার। এটি না থাকলে শিশুরা নিয়মিত ইনসুলিন নিয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মাধ্যমে একটি সুন্দর জীবন কাটাতে পারে।

অনেক বছর আগে যখন সামিয়া ইসলামের ডায়াবেটিস শনাক্তের পর, তখন তার শিক্ষকরা ভেবেছিলেন এটি একটি সংক্রামক রোগ। ফলে শ্রেণিকক্ষে কেউ তার পাশে বসতে চাইত না। শিক্ষক ও বন্ধুদের কাছ থেকে অমানবিক আচরণের শিকার হয়ে সামিয়াকে এক বছর শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। পরবর্তীতে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগ পর্যন্ত তাকে নানান বাধা মোকাবিলা করতে হয়।
সামিয়া বলেন, পড়ালেখার শেষ করার পর জীবন অনেকটা বদলেছে। এখন আমি ভাবি ডায়াবেটিস কোনো অভিশাপ নয় বরং এটি আমাকে নিয়মমাফিক চলার রুটিন করে দিয়েছে। কিন্তু এখন সমস্যা হলো- ডায়াবেটিস আছে শুনে আমার সঙ্গে ছেলে কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কোনো বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে চাইছে না। এখন আমার মনে হচ্ছে ছোটবেলার সেসব স্টিগমা ফিরে এসেছে। আমার মা-বাবাও এটা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত।

রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতাল বলছে, প্রতিষ্ঠানটির কাছে সর্বোচ্চ ১৬ বছরের ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৭ হাজার আট’শ বলে রিপোর্ট রয়েছে। প্রতি বছর নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা চার’শ থেকে পাঁচ’শ করে বাড়ছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর একে আজাদ খান বলেন, যদি কোনো শিশুর বারবার পিপাসা ও মূত্রত্যাগ হয় এবং হঠাৎ করেই ওজন কমে যায়, এটি ডায়াবেটিসের লক্ষণ। শিশুর এক বছর বয়সের পর যেকোনো সময়ই এটি ঘটতে পারে এবং এসব ক্ষেত্রে বাবা-মা ও অভিভাবকদের দ্রুত ডাক্তাদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ডায়াবেটিস নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। রোগটি নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হচ্ছে জীবনাযাপনের রীতি বদলে ফেলা। লাইফস্টাইল নিয়ন্ত্রণে এনে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের পক্ষেও স্বাস্থ্যকর ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। এ জন্য আমাদের সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে, ব্যাখ্যা করেন তিনি।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.