কবে হবে চালকদের ডোপ টেস্ট?

গণপরিবহনের চালকদের মাদকগ্রহণের অভিযোগ বেশ পুরোনো যা হরহামেশাই শোনা যায়। পরিবহনের চালক-শ্রমিকরা মাদকাসক্ত কিনা জানতে এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গেল বছরের ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অনুষ্ঠানে মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধে চালকদের ডোপ টেস্ট করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই নির্দেশের প্রায় চার মাস হতে চলেছে তবে এখনো বাস্তবায়ন হয়নি চালকদের ডোপ টেস্ট। একই সাথে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ হলো চালক শ্রমিকদের মাদকাসক্তি বলছেন যাত্রী অধিকার ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরে চালকদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে খানিকটা নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ডোপ টেস্ট চালু করার কর্মকৌশল ঠিক করতে গঠন করা হয় ৯ সদস্যের একটি কমিটি। এরই মধ্যে কমিটি কাজ এগিয়ে নিয়ে এসেছে। তবে এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরই মধ্যে চালকদের ডোপ টেস্ট কিভাবে করা হবে তার সুপারিশ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়েছে।
চালকদের ডোপ টেস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ’র মুখপাত্র ও রোড সেফটি শাখার পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব ই-রব্বানী বার্তা২৪.কম-কে বলেন, যখনই কোনো চালক বিআরটিএর কাছে লাইসেন্স করতে আসবেন, তখনই আমরা তাদের এই ডোপ টেস্ট করাবো। এছাড়াও টিমের মাধ্যমে এটি করা হবে যেমন, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও পুলিশের সমন্বয়ে বিভিন্ন টার্মিনালগুলোতে পরিবহন চালকদের সন্দেহ হলেই তাদেরকে আমরা টেস্ট করাবো। চালকদের ডোপ টেস্ট হাসপাতালের ল্যাবে করানো হবে বলে তিনি জানান।
কবে নাগাদ এই প্রক্রিয়া মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হবে জানতে চাইলে বিআরটিএর এই মুখপাত্র বলেন, চালকদের ডোপ টেস্ট করার একটি খসড়া কর্মপরিকল্পনার সুপারিশ আমরা ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা পর্যালোচনা শেষে মন্ত্রণালয় আমাদের যে সিদ্ধান্ত দেবে সে অনুযায়ী আমরা পরবর্তীতে ডোপ টেস্ট বাস্তবায়নে কাজ করব।

বিআরটিএ সূত্র বলছে, বর্তমানে চালকদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে চালকদের মাদকাসক্তি দেখার কোন ব্যবস্থা নেই। ডোপ টেস্টের কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন হলে, প্রথমে লাইসেন্স দেওয়ার সময় এবং পরবর্তীতে সেটি নবায়নের সময় বাধ্যতামূলকভাবে চালকের ডোপ টেস্ট করা হবে। সেক্ষেত্রে চালকের মাদকাসক্তি প্রমাণিত হলে তার লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
এদিকে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ডোপ টেস্টের ব্যয়ভার বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ নাকি মালিক-শ্রমিক বহন করবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, চালকদের ডোপ টেস্ট করার বিষয়ে আমরা বরাবরই আগ্রহ দেখিয়েছি। সবার প্রথমে আমরাই চালকদের ডোপ টেস্ট করার বিষয়ে সামনে আনি। প্রথম যখন বিআরটিএর সাথে আমাদের মিটিং হয় তখন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বিআরটিএকে আমরা সুপারিশ করেছি, চালকদের ডোপ টেস্ট করালে যে ব্যয় হবে, সেটি যেন বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়ে আমাদের সাথে বিআরটিএর আর কোনো আলোচনা হয়নি।
চালকদের ডোপ টেস্টের সার্বিক বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ডোপ টেস্টের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই টেস্টের খরচ কে দিবে। টেস্ট করাতে ৯০০ টাকা খরচ হবে। এখন এই টাকা যদি সরকার দেয় তাহলে সরকারকে বরাদ্দ দিতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। তাছাড়া ডোপ টেস্টের সাথে অনেক ধরনের টেস্ট আছে সুতরাং এর জন্য একটি নীতিমালাও লাগবে । এই সবগুলোর বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।
বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান আরও বলেন, বিআরটিএ এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো ডোপ টেস্টের খরচ পরিবহন মালিক এবং শ্রমিক সবাইকে মিলে দিতে। তবে মালিকপক্ষ সেটাতে রাজি হয়নি। তারা চাচ্ছে সম্পূর্ণ খরচ সরকার দিবে। তবে বিআরটির পক্ষ থেকে আমরা অনুরোধ করেছিলাম মালিকপক্ষ যেন খরচটা দেয়। তবে এখন যে অবস্থায় পৌঁছেছে সেটা সরকারের পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিআরটিএ এই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এজন্য সরকারের কাছে এসকল বিষয়ে সুপারিশ পাঠিয়ে দিয়েছি। সরকার আমাদের যত দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাবে, আমরা ততো তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করতে পারবো। তাছাড়া মুখের লালা দিয়েও মাদকাসক্ত পরীক্ষার কার্যকম কিন্তু চলমান আছে।

এদিকে, যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, দুর্ঘটনার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কিন্তু পরিবহন চালকদের মাদক সেবনের কারণে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটছে। গত বছরের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০২০ সালে ৪৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৬৮৬ জন নিহত, ৮৬০০ জন আহত হয়েছে। তাছাড়া ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৩.৩৯ শতাংশ এবং বেপরোয়া গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হায়িয়ে খাদে পড়ার ঘটনা ঘটেছে ০.৯৯ শতাংশ বলে জানা গেছে। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ভারী মোটরযানের চালকদের প্রায় ৬৯ শতাংশই মাদকাসক্ত। বিশেষ করে মহাসড়কে দীর্ঘ রুটে গাড়ি চালানোর সময় অনেক চালকই মাদক গ্রহণ করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বার্তা২৪.কম-কে বলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা হয়। তার একটি অংশ চালকদের মাদকাসক্তির কারণে হয় বলে আমরা মনে করি। আমরা প্রকাশ্যে দেখছি রাজধানীর সিটি সার্ভিসের যেসব বাসগুলো রয়েছে সেসব বাসের চালকরাও কিন্তু মাদক গ্রহণ করে। যা মালিকরাও প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। আমরা অবজারভেশন করে দেখেছি পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে পরিবহনের চালকরা এই মাদকাসক্তিতে জড়াচ্ছেন। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে পরিবহনের চালকরা মাদকাসক্ত হয়েই গাড়ি চালাচ্ছেন। এক পর্যায়ে বেপরোয়া চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে।
এই অবস্থায় চালকদের ডোপ টেস্ট দ্রুত বাস্তবায়ন করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্ঘটনা রোধে চালকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডোপ টেস্টের আওতায় আনা দরকার। এর আগেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য অনেক গাইডলাইন হয়েছে কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না, আসলে বাস্তবায়ন কে করবে ? সরকারি সংস্থা বিআরটিএ’র কথা কি বলবো তারা তো আসলে রাজস্ব আহরণে ব্যস্ত।
উল্লেখ্য, সারাদেশে ৪০ লাখ ৭২ হাজার ৬১৬টি লাইসেন্স আছে। এর মধ্যে ভারী যান চালানোর লাইসেন্স ১ লাখ ২ হাজার, মাঝারি মানের ১৫ হাজার ৪৭১টি ও হালকা যানের লাইসেন্স রয়েছে ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬টি। এর মধ্যে অপেশাদার ১০ লাখ। এছাড়া মোটরসাইকেল, থ্রি হুইলার ও অন্যান্য ক্যাটাগরির লাইসেন্স রয়েছে।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.