খেলাপি হওয়ার অপেক্ষায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকঋণ

১৬

ঋণ আদায়ের ওপর শিথিলতা থাকায় বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর শেষে আগের বছরের চেয়ে খেলাপি ঋণ কমে গেলেও প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এ অর্থ খেলাপি ঋণের ঘরে পৌঁছানোর আগের ধাপে অবস্থান করছে। আগামী জুনের মধ্যে আদায় না হলেই সংশ্লিষ্ট ঋণ খেলাপির নিম্ন স্তর অর্থাৎ নিম্নমানের (এসএস) খেলাপি ঋণের ঘরে চলে যাবে। এতে আগামী জুন শেষে খেলাপি ঋণের সামগ্রিক চিত্র বদলে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ৮৮ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এ দিকে খেলাপি ঋণ কমে গেলেও বছর শেষে ১১ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো সুদ আয় স্থগিত রেখেছে প্রায় সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ঋণের কিস্তি পর পর ছয় মাস পরিশোধ না হলে ওই ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। এর আগের স্তর হলো এসএমএ অর্থাৎ মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ। এ ঋণ ছয় মাস অতিক্রম করলেই তা খেলাপি হবে। খেলাপি ঋণ আবার তিন ধরনের। ঋণের কিস্তি ছয় মাস অতিক্রম হলেই সেটি খেলাপি ঋণের নিম্ন স্তর বা নিম্নমানের খেলাপি হয়। ৯ মাস অতিক্রম হলেই ওই ঋণ সন্দেহজনক খেলাপি। আর এক বছর পার হলেই তা মন্দ বা কুঋণ। একে ব্যাংকিং খাতে আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ বলা হয় । এ ধরনের ঋণ আদায়ের জন্য সংশ্লিøষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে ব্যাংকগুলোর মামলা করার অনুমোদন রয়েছে।
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব থেকে ব্যবসায়ীদের কিছুটা রেহাই দেয়ার জন্য এক বছরের জন্য স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে জুন মাস পর্যন্ত, এরপর আরো দুই ধাপে তা বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এ সময়ের মধ্যে কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে ঋণখেলাপি বলা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা কার্যকরের সময় গত ৩১ ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে আর কোনো সময় বাড়ানো হয়নি। শুধু মেয়াদি ঋণ পরিশোধে অবশিষ্ট সময়ের ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে তা দুই বছরের বেশি করা যাবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা যখন থেকে কার্যকর করা হয় ওই সময় অনেক ঋণের কিস্তিই তিন মাস অনিয়মিত ছিল। কোনো ঋণ চার মাস আবার কোনো ঋণ পাঁচ মাস পর্যন্ত অনিয়মিত ছিল। ফলে ওই সব ঋণ খেলাপি ঋণের পূর্ব স্তর বা এসএমএ ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন করে নির্দেশনা না দেয়ায় ওই সব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সময় ধীরে ধীরে ছয় মাস পার হয়ে যাবে। আর ছয় মাস পার হলেই ওই সব ঋণ খেলাপি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত ৩১ ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ৮৮ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ ছিল ১০ লাখ ৯৫ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিয়মিত ঋণ রয়েছে ১০ লাখ সাত হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। বাকি সাড়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ বা অনিয়মিত ঋণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঋণ শ্রেণীকরণ স্থগিত হওয়ার সময় ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এখন ওই সব ঋণের কিস্তি পরিশোধ না হলে তা ধীরে ধীরে অর্থাৎ ছয় মাসের মধ্যেই তা খেলাপি ঋণ পরিণত হবে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, আগামী মার্চের পর থেকে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র ব্যাংকের সামনে বের হয়ে আসবে। খেলাপি ঋণ এক লাফে জাম করতে থাকলে ব্যাংকগুলোর বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করা কষ্ট কর হয়ে পড়বে। এ নিয়ে অনেক ব্যাংকই চিন্তিত।

১১ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি : এদিকে ঋণ আদায়ের ওপর শিথিলতা দিয়ে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা হলেও কিছু ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে আমানতকারীদের আমনত সুরক্ষা করতে বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। এতে বেড়ে চলেছে প্রভিশন ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত ডিসেম্বর শেষে সরকারি-বেসরকারিসহ ১১ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতিতে ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। প্রভিশন ঘাটতি থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে পাঁচটি সরকারি ও ছয়টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক।
সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকার সুদ আয় স্থগিত : ব্যাংকিং খাতে মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার সুদ স্থগিত করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের মুনাফায়। আর মুনাফা কমে যাওয়ায় শেয়ারহোল্ডাররা বছর শেষে প্রকৃত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে একদিকে ব্যাংকগুলোর মুনাফার পরিমাণ কমে যাচ্ছে পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডাররাও বছর শেষে প্রকৃত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি টাকা আটকে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর নিট আয় কমে গেছে। শুধু ব্যাংকগুলোর নিট লোকসানই বাড়েনি, প্রায় ডজন খানেক ব্যাংকের ইতোমধ্যে মূলধন ঘাটতি বেড়ে গেছে।
গত ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতের ৭৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা মন্দ ঋণের বিপরীতে প্রায় সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা সুদ আয় খাতে আনা যায়নি। এটি ব্যাংকের আলাদা হিসাবে রাখা হয়েছে। ফলে ব্যাংকের আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর প্রকৃত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.