কৃষি ও পশু পালনে বদলে যাচ্ছে চরাঞ্চলের অর্থনীতি

১২

টি এম কামাল ॥ উত্তরাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীর চরে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছেন চাষিরা। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে। কৃষির পাশাপাশি পশুপালনেও ঘটেছে আশা জাগানিয়া বিপ্লব। চরে আবাদযোগ্য ফসল এবং চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের আরো সচেতন করা হলে আরো বেগবান হবে চরের অর্থনীতি।

এক সময় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মাসহ প্রধান শাখা নদীগুলো ছিল তাদের দুঃখের কারণ। এখন সেই নদীর চরেই বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে অভাব দূর হচ্ছে চাষিদের। অক্লান্ত পরিশ্রমে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন নদীভাঙা ভূমিহীন নিঃস্ব লাখ লাখ পরিবার। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মার অসংখ্য চরের বেলে-দোআঁশ মাটিতে এখন শাকসবজিসহ নানা প্রকারের ফসল ফলছে। গড়ে উঠছে গবাদিপশুর খামার। চরাঞ্চলের কৃষি ও গবাদিপশুর খামার পাল্টে দিচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র।

ইরিগেশন সাপোর্ট প্রজেক্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড নিয়ার ইস্টের (ইসপান) প্রণীত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, দেশের প্রধান পাঁচটি নদীতে চরের আয়তন প্রায় এক হাজার ৭২২ দশমিক ৮৯ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট জমির এক দশমিক ১৬ শতাংশ। এই পরিমাণ চরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চরভূমি রয়েছে উত্তরাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায়। ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় চরের পরিমাণ ৯৮৭ দশমিক ৬০ বর্গকিলোমিটার। পদ্মা অববাহিকায় চরভূমি ৫০৮ দশমিক ২৭ বর্গকিলোমিটার। মেঘনার উত্তর ও দক্ষিণ অববাহিকায় চরের পরিমাণ ২২৬ দশমিক ৭৫ বর্গকিলোমিটার। এই চর এলাকায় বাস করছে অন্তত সাত লাখ মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করে যমুনার চর এলাকায়। এ সংখ্যা প্রায় চার লাখ। ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা ও যমুনার বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য ছোট-বড় চরে গড়ে উঠছে জনবসতি। চর কৃষি ও পশুপালনই তাদের প্রধান পেশা।

সর্বনাশা নদীভাঙনে সব হরিয়ে ভূমিহীন নিঃস্ব হয়েছে অনেক পরিবার। নতুন করে চরে স্বপ্ন বুনছেন তারা। শুরুতে বালুচরে ফসল ফলানো পরের কথা, ঘাসও জন্মাতো না। কালক্রমে বন্যায় পলিমাটি জমে উর্বর আবাদি জমিতে পরিণত হচ্ছে চর। দীগন্ত বিস্তীর্ণ বালুচরে আবাদ হচ্ছে সরিষাসহ নানা প্রকারের ফসল। যে দিকে চোখ যায় শুধু হলুদ আর সবুজের সমারোহ। গম, কাউন, ভুট্টা, বাদাম, মিষ্টি আলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, লাউ, গাজর, মরিচ, হলুদ, শসা, সিম, কুমড়াসহ নানা প্রকারের শাকসবজি চাষ হচ্ছে চরে। চরের বেলে দো-আঁশ মাটিতে ডাল জাতীয় ফসল মাসকালাই, খেসারি, ছোলার প্রচুর আবাদ হচ্ছে।
চরে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেরই রয়েছে গরু-মহিষ-ছাগলের ছোট ছোট খামার। চরের এই বিপুল সম্ভাবনায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। তবেই সম্ভাবনাটি বাস্তবে রূপ নেবে। অভাব ঘুচবে অভাবি চরবাসীর। উৎপাদন বাড়বে দুধ কিংবা দুগ্ধজাত সামগ্রীর।

সিরাজগঞ্জের চৌহালীর স্থল ইউনিয়নের গোসাইবাড়ি চরের শুকুর ব্যাপারী বলেন, তিন বছর আগে সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কর্মসংস্থান ছিল না। বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে যমুনা চরে এসে নতুন বসতি গড়ি। গরু পালন করে এখন আমরা সাবলম্বী। আল্লাহর রহমতে সংসারে কোনো অভাব নেই। খাষপুখুরিয়া ইউনিয়নের কোদালিয়াচরের ময়নাল সিকদার, রজব আলী, উমরপুরচরের আবু ছাইদ ও কোরবান আলী জানান, চর এলাকায় খোলমেলা পরিবেশে গবাদিপশু পালন করায় রোগবালাই কম হয়। পলি মাটির আস্তরনে জেগে ওঠা ঘাস, বিচালি খাইয়ে তারা গবাদিপশু লালন পালন করছে। এজন্য চরে অনেকেই গরু-মহিষ-ছাগলের ছোট ছোট খামার গড়ে তুলছে। চরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একটি করে গোখামার গড়ে উঠছে। গোখাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় এই সমস্ত কৃষকরা তাদের গবাদিপশু নিয়ে এসেছে চরে।
তবে চরে বসবাসরত ছেলেমেয়েরা শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের লেখাপড়ার জন্য নেই কোনো স্কুল-মাদরাসা।

চৌহালীর মিনারদিয়ার চরের কৃষক আতাউল বলেন, আমাদের সন্তানদের জন্য শিক্ষারব্যবস্থা এবং চরে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আমরা দেশের মূল স্রোত থেকে বঞ্চিতই থেকে যাব। চরের সম্ভাবনাময় অর্থনীতিও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আমাদের দায়িত্ব পরিশ্রম করা। আমরা করে যাচ্ছি কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার দায়িত্ব সরকারের।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.