দারিদ্র্য হারে করোনার ধাক্কা

২২

বাংলাদেশের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য রয়েছে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার। আর এই বছরটিতেই বাংলাদেশ উদযাপন করতে যাচ্ছে দেশটির স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির উৎসব। সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মধ্য-আয়ের মর্যাদার বাংলাদেশের ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধিতে দেশের সব মহলের, বিশেষ করে গরিব জনগোষ্ঠীর ভাগ বসানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাওয়া হচ্ছে। একই উদ্দেশ্য সাধনে বাংলাদেশ সরকার প্রণয়ন করেছে ‘ভিশন ২০২১’ নামের রূপকল্প। সেই সাথে আছে ‘পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ১৯১০-২১’, যার রয়েছে কয়েক দফা উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। এসব কিছু বাংলাদেশকে অপরিহার্যভাবে একটি মধ্য-আয়ের দেশে রূপান্তর করে দেবে, এমনটি অবশ্য এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ, এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতি ও দারিদ্র্য হারে লেগেছে বড় ধরনের নেতিবাচক ধাক্কা।

মনে রাখতে হবে- এই লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশকে আরো যেসব মুখ্য লক্ষ্য অর্জন করতে হবে, তার মধ্যে আছে ২০২১ সালের মধ্যে দরিদ্রতার হার ১৪ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। ২০০০-২০১০ দশকে দেশে যে হারে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধিমাত্রা কমছে, সেই হার বজায় থাকলে ধরে নেয়া হয়েছিল, ৮ বছরে মোটামুটি দেড় কোটি লোককে দারিদ্র্র্যাবস্থা থেকে বের করে আনা যাবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বিগত এক দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে যে সাফল্য দেখা গেছে, সে সাফল্য অব্যাহত থাকলেও ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা সম্ভব না-ও হতে পারে। সে জন্য প্রয়োজন আরো বাড়তি পদক্ষেপ। বিশেষ করে দারিদ্র্যনাশের কর্মকাণ্ডে আরো গতি আনতে হবে এবং নিতে হবে নতুন কিছু জোরালো কর্মসূচি।
২০০০-২০১০-এর দশকে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়। এই সময়ে গড়ে প্রতি বছর এই প্রবৃদ্ধিহার ছিল মোটামুটি ৬ শতাংশ। এই সময়ে দারিদ্র্য কমানোর হারে বেশ ভালো ধরনের উন্নতি লক্ষ করা গেছে। এ সময়ে প্রতিবছর দারিদ্র্যহার কমেছে ১.৭ শতাংশ করে। অবশ্য এই সময়ে চীনে দারিদ্র্যের হার কমেছে বছরে ২.৫ শতাংশ করে। তবে বাংলাদেশে এই দারিদ্র্য কমানোর হার বাকি দুনিয়ার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সালের মাঝের সময়টায় চীন বাদে ভারতসহ বাকি দুনিয়ার বছরে দারিদ্র্র্য কমানোর হার ছিল ০.৯ শতাংশ। এই সময়ে বাংলাদেশে গরিব মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় কমেছে। ২০০০-২০১০-এর দশকে বাংলাদেশে গরিব মানুষের সংখ্যা ছয় কোটি ৩০ লাখ থেকে কমে দাঁড়ায় চার কোটি ৭০ লাখে।
এ দিকে ২০১০-২০২০ দশকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার যেভাবে স্থিতিশীল মাত্রায় বেড়েছে তেমনি স্থিতিশীলভাবে কমেছে দরিদ্র মানুষের হারও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার ২০১৮-১৯ রাজস্ব বছরে নেমে এসেছিল ২০.৫ শতাংশে। ২০১৭-১৮ রাজস্ব বছরে এই হার ছিল ২১.৮ শতাংশ। চরম দারিদ্র্য হারও ওই সময়ে ১১.৩ শতাংশ থেকে নামে ১০.৫ শতাংশে। কিন্তু কোভিড সময়ে বিশ্বের আরো অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই ধাক্কা যেমনি পড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর, তেমনি পড়ে দারিদ্র্য হারের ওপরও। প্লানিং কমিশনের জেনারেল ইকোনমিক ডিভিশনের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের হার নেমে এসেছিল ২০.৫ শতাংশে। ২০২০ সালের জুনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার পূর্ববর্তী রাজস্ব বছরের এক লাফে গিয়ে পৌঁছে গেছে ২৯.৫ শতাংশে। ওই সময়ে দেশে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসে। সর্বশেষ তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে চার কোটি ৯৪ লাখ ৩০ হাজার মানুষ ‘দরিদ্র’ বলে বিবেচিত। দেশব্যাপী যখন করোনাকালের শাটডাউন চলে, তখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ওই সময় হাজার হাজার নি¤œ-আয়ের মানুষকে কারো পক্ষ থেকে খাবার পওয়ার অপেক্ষায় শহরের রাস্তায় অবস্থান নিতে দেখা যায়। অনেক চাকরিহারা ও কাজহারা মানুষকে রাস্তায় বের হতে হয় নানা পণ্যের ভাসমান দোকান নিয়ে। অনেককে বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে যেতে হয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে।

পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম গণমাধ্যমে বলেছেন, চলতি বছরের মার্চ-জুন মাসে করোনা মহামারীর সময়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক লোক তাদের কাজ ও চাকরি হারিয়েছে। ফলে গরিব মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। তবে তিনি মনে করেন- ‘এখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ৯৫ শতাংশই আবারো খুলে দেয়া হয়েছে। তাই আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই দারিদ্র্যহার অনেকটা নেমে আসবে। অপর দিকে অষ্টম পাঁচসালা পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা কিছু লোককে দারিদ্র্যবৃত্ত থেকে বের করে আনতে পারব। সেই সাথে দারিদ্র্র্যহার করোনা-পূর্ব সময়ে ফিরিয়ে নিতে পারব।’
এ কথা স্বীকার্য- যদিও এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় একটু দেরিতেই বাংলাদেশে করোনা মহামারীর সংক্রমণ সূচিত হয়েছে, তবুও চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর প্রভাবেই জুন মাসে দেখা যায়, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২০ রাজস্ব বছরের হিসাব মতে, এ দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার। এর মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা চার কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার। আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে- করোনার প্রভাব থেকে এখনো আমরা মুক্ত হতে পারিনি। কবে এ থেকে মুক্তি পাবো, এর কোনো নিশ্চিত জবাব নেই। কারো কারো মতে, এর প্রভাব আরো কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। পুরো দশকজুড়ে এর তাণ্ডব চললেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তাই করোনা-উত্তর সময়ে দারিদ্র্য কমে যাবে, সে আশায় বসে থাকলে চলবে না। এখনই দারিদ্র্যবিমোচনের পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের মাঠে নামতে হবে এবং স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এ সময়ের দারিদ্র্যবিমোচন কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে।
এ দিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক গবেষণা সূত্রে জানা যায়, করোনার লক-ডাউন-উত্তর পরিবেশে দেশের দারিদ্র্যহার বেড়ে দাঁড়াবে ২৫.১৩ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্যহার হবে ২৪.২৫ শতাংশ। শহরাঞ্চলের দারিদ্র্যহার হবে ২৭.৫২ শতাংশ। বিআইডিএসেরর প্রক্ষেপণে আরো বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে সৃষ্টি হবে ১ কোটি ৬৪ লাখ নতুন গরিব লোক। কারণ, দীর্ঘদিনের করোনার প্রভাবে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

এ দিকে গত ৯ ডিসেম্বর ‘পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন’ (পিকেএসএফ)-এর বাস্তবায়নাধীন বহুমাত্রিক চরম দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি ‘পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর একস্ট্রিম পুওর পিপল’-এর অগ্রগতি তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়োজিত ওয়েবিনারে বাংলাদেশের দারিদ্র্যবিষয়ক যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা সত্যিই আমাদের চিন্তিত করে। ওয়েবিনারে প্রকাশিত তথ্যমতে, বাংলাদেশে চরম দরিদ্র পরিবারের মাসিক আয় দুই হাজার টাকার মতো। একে ‘তুচ্ছ’ আয়ই কলতে হবে। কারণ, এসব পরিবারের প্রতিদিনের আয় এক ডলারেরও নিচে। বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় যেসব ব্যক্তিকে প্রতিদিন সোয়া ডলার বা তার চেয়ে কম আয় দিয়ে সংসার চালাতে হয় তাকে শুধু দরিদ্র নয়, চরম দরিদ্র পরিবার বলে গণ্য করা হয়। আমাদের দেশে এসব চরম দরিদ্র পরিবারের ৪১ শতাংশ পরিবারেই প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তা নেই। দেশের ক্ষুদ্র উপজাতীয় নৃগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশই চরম দরিদ্র। ওরা প্রতিদিনের আয় দিয়ে দেড় কেজি চাল পর্যন্ত কিনতে পারে না। চরম দরিদ্র পরিবারের ৪৫ শতাংশই বসবাস করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, ৩৬ শতাংশের বসবাস হাওর এলাকায় এবং ৩০ শতাংশের বসবাস দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। হাওর এলাকার ও নৃগোষ্ঠীর চরম দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভঙ্গুর প্রকৃতির। কারণ, এসব পরিবারের ৯০ শতাংশে রয়েছে মাত্র একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, আবার কোনো পরিবারে একজনও উপার্জনক্ষমও নেই। তা ছাড়া, চরম দরিদ্র পরিবারগুলোর ১৭ শতাংশেরই পরিবার প্রধান হচ্ছে মহিলা, যারা সবচেয়ে দুস্থ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, জাতীয় স্বার্থে এবং সেই সাথে দেশের মধ্য-আয়ের দেশে উত্তরণ ঘটাতে এসব চরম দরিদ্রশ্রেণীর মানুষকে দারিদ্র্যবৃত্ত থেকে বের করে আনতে হবে। কারণ, এখন তারা জাতীয় বোঝা। ওদের দারিদ্র্যবৃত্ত থেকে বের করে আনতে পারলে তারাই হয়ে উঠতে পারে আমাদের মূল্যবান মানবসম্পদ। তারাই হবে প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাদের দারিদ্র্যবৃত্ত থেকে বের করে আনতে না পারলে আমাদের আপাত-লক্ষ্য, মধ্যম-আয়ের দেশে বাংলাদেশের উত্তরণ সম্ভব হবে না, তেমনি সাফল্য আসবে না চূড়ান্ত পর্যায়ে সমৃদ্ধ বংলাদেশ গড়ার কাজেও। তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে, কী করে বাংলাদেশকে ‘দারিদ্র্য’ নামের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা যায়? মধ্য-আয়ের দেশে উত্তরণের পথের বাধা হিসেবে বিবেচিত, দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিত করা যায়? অবশ্য সে প্রশ্নের জবাব পেতে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে কাজ চলছে। তবে এসব পদক্ষেপ দারিদ্র্য বিমোচন প্রত্যাশিত মাত্রায় নিশ্চিত করতে পারবে, তেমনটি বলা যাচ্ছে না। প্রয়োজন আরো জোরালো এবং নতুন নতুন পদক্ষেপ।
‘পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর একস্ট্রিম পুওর পিপল’ পিকেএসএফের ছয় বছরব্যাপী একটি বহুমাত্রিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি। এর লক্ষ্য, ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ লাখ চরম দরিদ্র লোককে দারিদ্র্য থেকে বের করে নিয়ে আসা। ‘প্রসপারিটি’ নামে সমধিক পরিচিত পিকেএসএফের এই কর্মসূচি চালু করা হয় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। এরই মধ্যে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে দেশের ১৫টি জেলার ৪৩টি উপজেলার ১৮৮টি ইউনিয়নের দরিদ্র মানুষকে। প্রথম বছরে ৩০ হাজার চরম দরিদ্র পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। এতে তহবিল জোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. খলিকুজ্জামান আহমদ মনে করেন- এসব লোক দরিদ্র বা চরম দরিদ্র থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে, তাদের সামনে বিকল্প কোনো পছন্দ নেই। আর পিকেএসএফ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তাদের পছন্দে ভিন্নতা আনার জন্য। তিনি মনে করেন, পছন্দের এর মাধ্যমে তাদের দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব।
দরিদ্র মানুষের সামনে যত বেশি বিকল্প সৃষ্টি করা যাবে, ততই তারা দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ বেশি পাবে। এতে বিতর্কের অবকাশ নেই। তবে এখানেই শেষ নয়- তাদের পছন্দের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি নজর দিতে হবে তাদের জন্য বাজারে ও অর্থায়নের উৎসে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে। তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারেও উদাসীন থাকলে চলবে না। কারণ সক্ষমতা সূত্রেই মানুষের সামনে যেমনি পছন্দের পরিধি বাড়ে, তেমনি বাড়ে আয়ের সুযোগও। এসব দরিদ্র মানুষের সক্ষমতা ধরে রাখতে তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, দারিদ্র্য ডেকে আনে নানা রোগশোক। এ ছাড়া আরেকটি বিষয়ের ওপর নজর রাখাটাও দারিদ্র্যবিমোচনে সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে নতুন করে দরিদ্র সৃষ্টির প্রবণতা ঠেকানো। কেননা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ দরিদ্র সৃষ্টির অন্যতম কারণ। তাই প্রতিটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সম্ভাব্য ভঙ্গুর পরিবারগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার, যাতে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে না পারে।
করোনাকালে নতুন করে দরিদ্র হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠী করোনা-উত্তরকালে আপনা-আপনি দারিদ্র্যবৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসবে, এমনটি ধরে নেয়া ঠিক হবে না। করোনাকালে সৃষ্ট নতুন দরিদ্রশ্রেণীকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে প্রয়োজন যথাযথ পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে, তাদের দরিদ্র হয়ে ওঠার ঘটনাটি ঘটেছে ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে। এই দারিদ্র্যবিমোচন প্রক্রিয়ায় তাই প্রচলিত কৌশল কাজে লাগানোর পরিবর্তে বিশেষ কৌশল নিয়ে মাঠে নামতে হবে। তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া প্রয়োজন, যাতে করোনা-উত্তর এক বছরের মধ্যে কিংবা করোনা চলাকালেও ওরা নিজেদের স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে পারে। তা ছাড়া সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের সাময়িক চাকরির ব্যবস্থা করতে পারে। সে জন্য আমাদের বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে।
সর্বোপরি বলা দরকার- বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে সম্পদের পরিধি বেড়েছে। সেই সাথে বৈষম্য বেড়েছে আরো বেশি মাত্রায়। ধনী আরো বেশি ধনী হয়েছে, গরিব হয়েছে আরো বেশি গরিব। এই প্রবণতা এখনো চলমান। এই প্রবণতা দারিদ্র্যবিমোচনের পথে এক বড় বাধা। উপযুক্ত নীতিকৌশল অবলম্বন করে সম্পদে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্তের ভাগ বাড়াতে হবে। ধনী-গরিবের সম্পদ মালিকানায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে দারিদ্র্য বিমোচন বরাবরের মতো স্বপ্নই থেকে যাবে।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.