শেরপুর মানুষ কেনাবেচার হাট!

২৯
আব্দুল ওয়াদুদ : 
তীব্র শীত ঘন কুয়াশায় রাস্তার উপর বাঁশের ডালি আর কোদাল হাতে মানুষগুলো ভিড় জমাচ্ছেন মানুষের হাটে! হ্যা ঠিকই শুনেছেন, বগুড়ার শেরপুরের ধুনট-শেরপুর রোডের ঘাটপার এলাকায় মানুষের হাটে, মানুষ কেনা বেচার হাটে!
প্রাচীনকালে ও মধ্যযুগে সমাজে মানুষ কেনা-বেচার হাট বসত। সেই দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে কবেই। কিন্তু একাবিংশ শতাব্দীর তথ্য-প্রযুক্তির যুগেও ক্ষুধা আর দারিদ্রের নির্মম আঘাতে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো দু’বেলা রুটিরুজির জন্য আজও নিজেকে বেচে দেন মানুষের হাটে।
বগুড়ার শেরপুরের ঘাটপার (রনবীরবালা ঘাটপার) এলাকায় তেমনি একটি হাট যেখানে ৩ শ্রেনীর মানুষ কেনা বেচা হয়। প্রতিদিন সকালে বসে মানুষের হাট এখানে মানুষ ক্রয় বিক্রয় হয়। এখানে শুধু কৃষি জমি নিরানির জন্য বয়স্ক মানুষ ১শ ৫০ থেকে ২শ টাকা, ধান কাটা ৩শ থেকে ৪শ টাকা এবং মাটি কাটার জন্য ৩৫০ টাকা থেকে ৫শ টাকা মানুষ ক্রয় বিক্রয় হয়। ভোরে মানুষে সরগরম হয়ে ওঠে এই বাজার বেলা উঠার সাথে সাথে বাজার শেষ হয়ে যায়। শ্রমের এই বাজারে শ্রমিক কিনতে আসেন মালিকেরা। অনেক শ্রমজীবী বিক্রি হলেও অনেকেই থেকে যান অবিক্রিত তারা বাড়িতে ফিরে যায়।
সংসার চালানোর জন্য নিজেকে প্রতিদিন বিক্রি করতে আসেন মানুষের হাটে এমন একজন ঘোলাগাড়ি গ্রামের সাকর উদ্দিনের ছেলে আব্দুল হাই বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে এখানে আসি। সেই ১০টাকা থেকে শুরু করে আজ ৪শ থেকে ৫শ টাকায় বিক্রয় হয়। ভাগ্যের পরিহাসে কোন কোন দিন থেকে যান অবিক্রিত। কুসুম্বি ইউনিয়নের বাগড়া এলাকার জহুরুল ইসলাম জানান, সকালে না আসলে আমাদের বাড়ীর চুলা জলে না। পরিবার না খেয়ে থাকবে। তারই বাস্তব প্রমান করোনার জন্য যখন আমরা ঘরবন্দি হয়ে ছিলাম তখন কেউ আমাদের সহযোগিতা করেনি। অনেক দিন না খেয়ে দিন কাটিয়েছি। শুনেছি সরকার অনেককিছু দিচ্ছে আমরাতো সুগুলো পাই না মেম্বর, চেয়ারম্যানকে যারা টাকা দেয় তারা পায়।
দিনমজুর মামুর শাহী এলাকার, শাহাদত ও চাঁন মিয়ার সঙ্গে কথা হয় তিনি বলেন, করোনার মধ্যে আমরা না খেয়ে দিন পার করছি। তারপর সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা পাইনি। যখন যে কাজ পাই সেই কাজ করি। আমাদের সন্তানেরা নিজেরাই চলতে পারেনা, আমাদের কি দেখবে? তাই প্রতিদিন কামলা দিতে হয়। কামলার হাটে দাম একটু বেশি পাই। কেউ কিনলে, কোনদিন ৪০০ আবার কোনদিন ৫০০ টাকা থাকে।
মানুষ কিনতে আসা রফিক তিনি বলেন, শ্রমিকের দাম একটু বেশি হলেও এখানে সহজে কাজের লোক পাওয়া যায়। একজন ইট, বালি ও মাটি সরানোর জন্য মানুষ নিতে এসেছি নিয়েছি ৩০০ টাকায়। মানুষের এই হাটে বেচাকেনা চলে কাকডাকা ভোর থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত। দাম দর ঠিক হয়ে গেলে শ্রমজীবী মানুষগুলো রওনা হন মালিকের গন্তব্যে।
সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা-৬ টা পর্যন্ত ঘাম ঝরিয়ে কাজ করেন কঠোর পরিশ্রমী মানুষগুলো। মজুরী বুঝে পেলে এবার বাড়ি ফেরার পালা।
এরপর আরও একটি ভোরের অপেক্ষা, কাজের জন্য ছুটেচলা মানুষের হাটে। কয়েক যুগেরও বেশি আগে থেকে শেরপুর ঘাটপার এলাকা নামে পরিচিত এখানে মানুষের হাট বসে।  এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিতই মানুষ বেচা কেনা হয়। ঘাটপার এলাকায় নিয়মিত হাট বসলেও মানুষের হাটে নেই কোন খাজনা, সমিতির ঝামেলা, হাট কমিটির চাঁদাবাজি। নিজের আপন গতিতেই চলে এই হাট। শ্রমজীবী মানুষেরা সেদিক দিয়ে শান্তিতে থাকলেও তাদের কাজের নিশ্চয়তা এবং জীবনের নিরাপত্তা অনিশ্চিত।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিয়াকত আলী সেখ বলেন, সরকারি কোন বরাদ্দ আসে তাহলে তাদের সহযোগিতা করা হবে। তবে আমি যতটুকু পারি সহযোগিতা করব। এই মুহুর্তে সরকারের কোন বরাদ্দ নেই।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.