ধুনটের ইউএনও’র একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগে

0 129

।। রেজাউল হক মিন্টু ।।

দিন কয়েক আগে ধুনট প্রেসক্লাবে গিয়ে বসেছি। কিছুক্ষণ পর বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বেশ কয়েকজন ভদ্রলোক ঢাউস আকারের একটি ফুলের তোড়া হাতে কক্ষে প্রবেশ করলেন। আলাপচারিতায় জানা গেল তারা রফিক-শ্রাবণের নেতৃত্বে ধুনট প্রেসক্লাবের পুনর্গঠিত কমিটিকে সংবর্ধনা দিতে এসেছেন। ভাল লাগলো শুনে। চমৎকার! করোনা মহামারির এই দুঃসময়েও মানুষ সংবাদপত্র, সংবাদপত্র সেবীদের মনে রেখেছে। আশ্বস্ত হই এই ভেবে যে কলম সৈনিকদের নিরাবেগী আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। হয়তো ফুরোবেও না কোনদিন।
ভাবছিলাম প্রেসক্লাব ও সংশ্লিষ্ট জনদের কাজটা কী। সর্বস্তরের অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতির প্রতিবাদ। প্রতিরোধের চেষ্টায় জনমত সৃষ্টিতে সাহসী ভূমিকা রাখা। আমজনতার না বলা কথা বলা। একটি কল্যাণকর জাতি-রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। আমরা দেখি পত্রিকাগুলো সেকাজটি করে আসছে নিরলসভাবেই। আমরা যদি পিছন ফিরে ইতিহাসের দিকে একটু তাকাই দেখবো মহান মুক্তিযুদ্ধের পুর্বে এই প্রিয় দেশটিকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করতে পত্রিকাগুলো কী অনবদ্য এবং অসামান্য ভূমিকাই না পালন করেছে। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার “মুসাফির” ছদ্মনামের অসাধারণ কলাম নিষ্প্রাণ দেহেও প্রাণ সঞ্চার করতো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘সংবাদ’ এর জহুর আহমদ চৌধুরীর কলাম “দরবার-ই-জহুর”তো কিংবদন্তিই হয়ে আছে।
মূলত এ কথাগুলো বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি বলতে চাইছি এতো এতো কাজগুলো করার পরও পত্রিকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সান্তনা পাওয়ার মত কী পেয়েছে। লেখালেখিতো কম হলো না, হচ্ছে না। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া দেশটির আজ একি চেহারা! খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের বিবেক আজ স্তব্ধ। প্রেম প্রীতি, ভালোবাসা এখন কেবলমাত্র আভিধানিক শব্দ। সাধারণ মানুষ পদে পদে নাজেহাল। সবই যেন মানুষের গা সওয়া হয়ে গেছে। পত্রিকা খুললেই নেতিবাচক বিচিত্র সব সংবাদ। ইতিবাচক সংখ্যালঘু। দুঃখ হয়, কষ্ট পাই। খুব বেশী কষ্ট পাই যখন দেশের প্রচন্ড গর্ব আর অহংকার, দেশের সূর্য সন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধাদের কারও লাঞ্ছিত হওয়ার, নির্যাতিত হওয়ার, সর্বোপরি বীরমুক্তিযোদ্ধা পিতা ও তাঁর সন্তান ওয়াহিদা খানমদের উপর দুর্বৃত্তদের ন্যাক্কারজনক হামলার খবর দেখি। বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। শরীরে চিমটি কেটে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি এই দেহে এখনও প্রাণ আছে কী না।
হাজারো রকমের হতাশা নিরাশায় যখন আকণ্ঠ নিমজ্জিত তখন পত্রিকায় একটি খবর দেখে নড়ে চড়ে বসি। যে খবরকে কেন্দ্র করেই বক্ষমান নিবন্ধের অবতারনা। খবরে প্রকাশ, ধুনট উপজেলার নবাগত নির্বাহি অফিসার সঞ্জয় কুমার মহন্ত এক বীরমুক্তিযোদ্ধার জন্মদিনে তাঁর বাড়িতে প্রতিনিধির মাধ্যমে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তার সাথে মুঠোফোনে কুশলাদি বিনিময় করেছেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধা নিজেও জানতেন না সেদিনটি তার জন্মদিন ছিল। মাঠ প্রশাসনের একজন কর্তাব্যক্তির কাছ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পেয়ে অবহেলায় অযতেœ জীবন সায়াহ্নে পৌছে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধার মনের অবস্থা কী হয়েছিল তা আমরা অনুমান করতে পারি। এ ছিল তাকে চমকে দেওয়ার মতো একটি ঘটনা। আজ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, প্রশাসন সবখানেই সৃষ্টিকে ভাল না বাসা, শ্রদ্ধেয়জনকে শ্রদ্ধা না করা, মাননীয়কে মান্য না করার বহমান সংস্কৃতির মধ্যে ইউএনও মহোদয়ের এটি বিবেক প্রসূত একটি ব্যতিক্রমী ভাবনা। যিনি এ প্রশংসনীয় কাজটি করেছেন সেই ইউএনও’র সাথে লেখকের কথা হয়। তিনি জানালেন তাঁর পরিকল্পনার কথা। বললেন তার উপজেলার সকল বীরমুক্তিযোদ্ধাদের জন্মতারিখ সংগ্রহ করে টেবিলে রেখেছেন। প্রতি জন্মদিনে তিনি নিজে অথবা তাঁর প্রতিনিধির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবেন। তাঁকে সাধুবাদ জানাই।
স্বীকার করতেই হবে মুক্তিযোদ্ধারা কোন কিছু চাওয়া পাওয়ার জন্য, আর্থিক বা বৈষয়িক দিক থেকে লাভবান হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেননি। জীবন উৎসর্গ করেননি। দেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার টানে তারা যুদ্ধ করেছেন। বয়সী মুক্তিযোদ্ধারা একটু ভালোবাসা একটু মর্যাদা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চান। অদ্ভুত একটা উল্টাপাল্টা নিয়মের মধ্যে চলছি আমরা। রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী বছরে দুইটি দিবস ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করা হয়। বছরের বাকি দিনগুলোতে কেউ আর তাদের খোঁজ রাখে না। মুক্তিযোদ্ধা কেউ মারা গেলে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়। মরদেহ জাতীয় পতাকায় আবৃত করা হয়। কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সবই ঠিক আছে কিন্তু রোগে-শোকে কাতর, অভাব-অনটনে জীবনের ঘানি টানতে টানতে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অনেক অস্বচ্ছল, গৃহহীন, দুঃস্থ, খেটে খাওয়া নি¤œজীবি মুক্তিযোদ্ধার আত্মা কি মৃত্যুর পরে এই মর্যাদা প্রাপ্তিতে তৃপ্ত হয়? ভ্রম কি না জানিনা আমার মনে হয় রাষ্ট্র যখন মৃতকে মর্যাদাদানে ব্যস্ত মৃতের আত্মা তখন কফিনের ভিতর ডুকরে ডুকরে কেঁদে বলে “জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এতে ফুল”।
আমরা তাদের বোবা কান্না শুনতে পাই না। আমার এক সময় আক্ষেপ ছিল আমি জীবনানন্দ দাসের সান্নিধ্য পাইনি। সান্নিধ্য পাইনি বনলতা সেনেরও। কিন্তু এখন আমার আর কোন আক্ষেপ নেই। আমি এমন এক মহৎ প্রাণের সাক্ষাৎ পেয়েছি যিনি মানুষকে ভালোবাসতে জানেন। দেশের বীর সন্তানদেরকে সম্মান করতে জানেন। অর্থ নয়, কড়ি নয়, একটি মাত্র ফুল দিয়ে জাতীয় বীরদেরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর যে সংস্কৃতি বিগত পঞ্চাশ বছরেও শুরু করা যায়নি ইউএনও মহোদয় সেই কাজটি করে ইতিহাস ছুঁয়েছেন। সকল বীরমুক্তিযোদ্ধার পক্ষ থেকে তাঁকে লাল সালাম।
লেখকঃ শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধার সন্তান, কলাম লেখক

Loading...