দেশ থেকে দেশে করোনার অভিজ্ঞতা (আরব সাগর)-ক্যাপ্টেন এবিএম ফখরুল ইসলাম

0 40

২৬ ফেব্রুয়ারী, বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছি। এক রকম প্রস্তুতি ছাড়া দেশ ছাড়তে হচ্ছে। জাহাজে যোগদান করতে হবে সিংগাপুরে। গত নভেম্বরে সিংগাপুর থেকে জাহাজ থেকে নেমেছি। পরিবার ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছে। মায়া কাটেনা, পরিবারের সাথে আড্ডা, বন্ধুদের সাথে হৈ হল্লা করে যে কয়দিন কাটিয়েছি কিন্তু আজ থেকে আর হবে না কয়েক মাসের জন্য। পরিবারের সকলে সান্তনা দিল কেউ মন খারাপ করে দাড়িয়ে রইলো। আবার সকলে বিদায় নিলো। আমার মতে বিমান ভ্রমণ পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে ভ্রমন। ভ্রমন কালীন কোন কিছু করে শান্তি পাওয়া যায়না, খেতে ভাল লাগেনা, ঘুমাতে ভাল লাগেনা, এমনকি সিনেমা দেখতেও ভাল লাগেনা। এই কারনে ভ্রমনের পুরো সাময়টা কাটে অশান্তিতে। কিছু মানুষ আছে বিমানে উঠা মাত্র নাক ডেকে ঘুম দেন, তাদের ঘুম ভাঙে বিমান ল্যান্ড করার আগে। আমি ঘুমাতে পারিনা। এখন এটা আমার কাছে দুধভাত। বিমান বন্দরের ব্যস্ততা, যাত্রীদের কোলাহল সবই ভাল লাগে। হঠাৎ দেখা যায় কাউন্টার জনাকীর্ণ, আবার ঘন্টা খানেক পর পুরো ফাঁকা। বিমান ল্যান্ড করেছে ঘন্টা খানেক আগে। আমার নামের ভুলের কারনে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স পেতে দেরি হচ্ছিল। ইমিগ্রেশনে কাউন্টারে বসে আছি। আমার সাথে প্রধান প্রকৌশলীর ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার হওয়াতে এজেন্ট তাকে জাহাজে নিয়ে গেছে। প্রাসাংগিক যে আমার ক্লিয়ারেন্স পেতে দুই দিন লেগেছিল এবং এই দুই দিন চাংগি বিমান বন্দরের ভিতর হোটেলে জামাই আদরে দিন কাটছিল। এই হোটেলে থাকা কালীন অধ্যাপক শনের সাথে পরিচয়। পরিচয় পর্বের শুরু ছিল আমার মুখবন্দি কাপড়ের তৈরী মাস্ক নিয়ে। শনের মতে আমি যে মাস্ক পড়েছি তা দিয়ে করোনা জীবাণু প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। আমি সাথে সাথেই মাস্ক ফেলে দিয়েছি। অধ্যাপক শন আমাকে তার ব্যাগ থেকে একটা মাস্ক উপহার দিয়েছিলেন। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলাম। নিপাত ভদ্রলোক, লম্বা ছিপ ছিপে অনুজীব বিজ্ঞানী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যপনা করছেন। করোনা সংক্রান্ত মূল্যবান তথ্য তার কাছে জেনেছিলাম। আমি যখন শুনছিলাম তখন মনে হচ্ছিল করোনা জীবানুকে সিনেমার মত করে দেখছি। আসলে তার ছাত্র হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। শনের ভাষায় করোনা ভাইরাসে বিদ্যমান আছে সুন্দরভাবে অভিযোজিত মিউটেশন, সহজ ভাষায় নিখুঁত মহামারী ঝড়।

২০১৩ সালে অশ্ব ক্ষুরের মত দেখতে বাদুড়ে পাওয়া করোনা ভাইরাস শুধু বাদুরকে সংক্রমন করেছিল। বলা বাহুল্য এই বাদুর এতই ছোট এটা আপনার হাতের তালুতে নিলে তালুর কিছুটা জায়গা বেচেঁ গেছে। ওজন বল পয়েন্টের কলমের চেয়ে একটু বেশী। জীবটার বসত অন্ধকারে। বাদড় ভাইরাসের আধার, শনের মতে ২০১৩ সালে চীনা বিজ্ঞানীরা বাদুড়ের মুখের লালা পরীক্ষা করে যে ভাইরাস পেয়েছিল তা কখনো আগে দেখেননি। এটা এক ধরনের করোনা ভাইরাস ছিল যা অনেকটা সার্স ভাইরাসের মত। বলা বাহুল্য করোনা ভাইরাস কয়েক ধরনের হতে পারে। আপনাদের মনে থাকার কথা এক দশক আগেও সার্স ভাইরাস বিশ্বজুরে তোলপার তুলেছিল এবং কোন কারণ ছাড়াই হারিয়ে গেল। অধ্যাপক শনের মতে সার্স কোভ-২ ভাইরাসের জীনতত্ব ও বিবর্তনের সেরা বিশেষজ্ঞ মিস্টার হোমস, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির একজন গবেষক। প্রসঙ্গত সার্স কোভ-২ ভাইরাসই কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী। শনের মতে “হোমস উহানের সামুদ্রিক খাবার এবং বন্যপ্রাণী বেচাকেনার বাজার ঘুরে ঘুরে দেখেছেন।
২০০৩ সালের সার্সের কথা নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে। এই ভাইরাসের কারণে ৭৪৮ মানুষের মুত্যু হয়েছিল। অতপর এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। ফলে মানুষ মানষিক স্বস্তিতে থাকে। তারা এটিকে আর প্রাসাঙ্গিক বলে মনে করেননি। হোমসের গবেষণা থেকে জানা যায়, সার্স কোভ-২ দুটি কাজ করতে চায়। প্রথমত মানব কোষে সংযুক্ত হতে চায় এবং এরপরে কোষের ভিতরে প্রবেশ করতে চায়। আমাদের শরীর অঢেল পরিমান ফিউরিন উৎপাদন করে এবং এই ফিউরিনের মাধ্যমে ভাইরাসটি খুবই সক্রিয় হয়। ফিউরিনের মাধ্যমে সমন্বিত হয়ে করোনা ভাইরাসকে এত সংক্রামক করে তুলেছে।
নিশ্চয় বার্ডফ্লুর কথা আপনারা ভুলে যান নি। এই বার্ড ফ্লু ফিউরিনের দ্বারা খুবই সক্রিয় হয়। কিন্তু আমরা ভাগ্যবান এই জন্য যে বার্ড ফ্লু করোনার মত আমাদের কোষে সংযোজিত হতে পারে নি।
হোমসের মতে বাদুড় থেকে পাওয়া ভাইরাস মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে নি। তবে এই ভাইরাসটি একটু জ্বীনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে যে মহামারী আকার ধারণ করেছে তার কারণ বন্যপ্রাণীর অবাধ হত্যা ও ভোজন বিলাসী হওয়া। তার মতে এই ভাইরাসটি প্রথমে বাদুড় ও তারপর বনরুই নামক প্রাণীর মাধ্যমে অভিযোজিত হয়ে যে কোন কারনেই হোক মানব শরীরে প্রবেশ করেছে। হোমসের মতে বাদুড়ে পাওয়া করোনা ভাইরাস ফিউরিনে সক্রিয় হয় না। কিন্তু মানুষের শরীরে পাওয়া করোনা ভাইরাস ফিউরিনে খুবই সক্রিয়। তাহলে বুঝা যাচ্ছে বাদুড় ও মানুষের মধ্যবর্তী কোন প্রাণী আছে যার মাধ্যমে মানব শরীরে এই অভিযোজিত জীবাণু ঢুকে পড়েছে। তাদের গবেষণাতে বণরুইয়ে এই অভিযোজিত করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়।

হোমস তার গবেষনার জন্য চীনা সামুদ্রিক এলাকা ও বন্যপ্রাণীর বাজারে ঘুরে ঘুরে দেখতে যেয়ে বনরুইয়ের প্রচুর কেনা বেচা দেখেছেন। ধারণা করা হচ্ছে উহানের বন্যপ্রাণীর বাজারে করোনার বাজারজাত করনের শুরু হয়। বনরুই হল তার বাহক। সত্য কথা হল বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাজার বন্ধ করতে হবে। বাদুড়ের অবস্থান থেকে মানুষের দুরত্ব বাড়াতে হবে। এটা খুবই পরিস্কার বন্যপ্রাণী থেকে সংস্পর্শে আসা অবশ্যই কমাতে হবে।
হঠাৎ ফোন কেঁপে কেঁপে বেজে উঠছিল। মিষ্টার শনের ইশারাতে বুঝতে পারি যে আমাকে ফোন ধরতে হবে। কথা শুনতেই দু ঘন্টা কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি। আমার ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার হয়ে গেছে। হোটেলে সব কাজ শেষ করে এখনিই জাহাজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হবে। মিষ্টার শনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। শনের দেওয়া মুখোস মুখবন্দী করে ছুটে চলছি জাহাজের উদ্দেশ্যে ।
সিংগাপুর দ্বিতীয় দেশ মনে হয়, এখানে জাহাজে কতবার যোগদান করেছি তার হিসেব দিতে গেলে ভুল হবে, প্রতিটি গলি আমার চেনা। পরিপাটি করে সাজানো পুরো সিংগাপুর মনে হচ্ছে মুখোশে মুখবন্দী। খুব হৈ হল্লা দেখছি না। সকলেই সকলের নিকট থেকে একটু দূরে অবস্থান করছে। কাউকে খুব বেশি কথা বলতে দেখছিনা। প্রথমে আমি বুঝতে পারি নি যে করোনার কারনে এরা সামাজিক দুরত্ব মেনে চলছে। এজেন্টের গাড়িতে শহর ছেড়ে সমুদ্রের তীরে এসেছি। জাহাজে যোগদানের জন্য সীপোর্টে ইমিগ্রেশনে ক্লিয়ার করে আমাকে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের নীচে দাড়াতে হল। কোরান্টাইন অফিসার আমাকে জানিয়ে দিল যে তাপমাত্রা স্বাভাবিক আছে। ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করি এবং স্পিটবোটে উঠে আলফা অ্যাংকোরেজে থাকা জাহাজের উদ্দেশ্যে রওনা দিই।
অজানা আশংকাতে ছুটে চলছি। এক মহামারীর প্রলয়ের ধ্বণি কানে বাজছে। মিষ্টার শনের কথা যদি বাংলাদেশে থাকা কালীন শুনতে পেতাম তাহলে জাহাজে যোগদানই করতাম না। আমার পরিবার আমার দেশ জানতে পারছে না কি ভয়াবহতার দিকে সারা বিশ্ব এগোচ্ছে।
সিড়ি বয়ে জাহাজে উঠছি। জাহাজের জনা কয়েক ক্রু আমার ব্যাগ জাহাজে তুলছে। ক্যাপ্টেন ওয়াং এসে আমাকে অভিনন্দন জানাল এবং ক্যাপ্টেন ওয়াংকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি কেবিনে চলে যাই। আবেগ আর সংবরণ করতে না পেরে চোখ দিয়ে নিঃশব্দে পানি ঝড়ছে। ভাবছি আমি মানুষ নই। দেখে শুনে আমার পরিবারকে বিপদের দিকে ঠেলে দিলাম। একটু পরে কেবিনের ফোন বেজে উঠলে নিজেকে সামলে নিয়ে ফোন ধরলাম। অন্যপ্রান্তে ক্যাপ্টেন ওয়াং ব্রীজে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। কোরিয়ান অধিবাসী, কর্কশ চরিত্রের, রসবোধ নেই বললেই চলে, বয়স ষাটোর্ধ, পুরো সময় আমাকে খুব বেশী সহযোগিতা করেন নি। তার বয়সের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য অনেক বেশী, আমি তার ছেলের বয়সী, তাই পুচকে ক্যাপ্টেনের সাথে সাবলীল হতে পারেন নি। ন্যাভিগেশন ব্রীজে দ্রুত গিয়ে দেখতে পেলাম সকল ক্রু নেমে যাচ্ছে।
প্রধান প্রকৌশলী আমার সাথে দেখা করে বললো যে সকল ক্রু পরিবর্তন করা হয়েছে। এদের কেউ মায়ানমারের, অফিসার সকলে কোরিয়ান। আগামি কাল নতুন ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানি ক্রু যোগদান করবে। আমি ও প্রধান প্রকৌশলী শুধু বাংলাদেশি। জাহাজে যোগদানের আগে আমাকে এসব কিছু জানানো হয়নি। করোনা ভাইরাস, নতুন ক্রুর নাম শুনে আমার মাথায় বাঁজ পড়ল। সবকিছু এলোমেলো লাগছে। আমি জাহাজের নতুন ক্যাপ্টেন, পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। চোয়ালে দাত চেপে নিজেকে শক্ত করলাম। জাহাজের পুরাতন ক্যাপ্টেন আগামি কাল চলে যাবে। ক্যাপ্টেন ওয়াং এর নিকট থেকে সারা রাত ধরে জাহাজ বুঝে নিলাম। দেশে চলে যাচ্ছে, খুশিতে মদ্যপান করছে অনবরত। কেবিন যখন বুঝে নিয়েছি, প্রথম কাজ ছিল নানা রং এর সুন্দর সুন্দর মদের বোতল ফেলে দেয়া। মদের বোতলে ফ্রিজ, লকার ভর্তি ছিল। দীর্ঘ সমুদ ্রজীবনে কখনও মদ ছুয়েও দেখেনি। তাই এটার প্রতি টান নেই ।

মিষ্টার শনের কথা মতে সারা পৃথিবী বন্ধ হয়ে যাবে। অসংখ্য লোক মারা যাবে। এক প্রলয় মহামারী, শনের কথা আমি যখন শুনছি তখন আমলে নেইনি। শনের কথা ভাবছি আর চিন্তা করছি কি করণীয় এরকম পরিস্থিতিতে পূর্বের কোন অভিজ্ঞতা আমার নেই। কয়েকশ মিটারের এই জাহাজে আমি ই সব। আমাকেই ভাল মন্দ নিয়ে ভাবতে হবে। মিষ্টার শনের নিকট থেকে জানতে পেরেছি করোনা থেকে দূরে থাকতে হলে নিরাপদ দূরত্ব, মাস্ক ব্যবহার করা, প্রচুর পরিমানে রৌদ্র ম্লান করা ভাল। সাথে স্যানিটাইজার সলুশন দিয়ে হাত পরিস্কার করলেও করোনা ভাইরাস থেকে দূরে থাকা সম্ভব।
জাহাজের কমান্ড নিয়ে পুরো জাহাজকে স্যানিটাইজেশন করে কোরান্টাইন অফিস থেকে সার্টিফিকেট নিয়েছিলাম।
তারপর পর্যাপ্ত পরিমান খাবার পানি, মাস্ক, গ্লাভ্স স্যানিটাইজ সলুশন জ্বালানী রসদ নিয়ে তাইওয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। ১২ মার্চে তাইওয়ানে পৌছে জানতে পারলাম যে সাড়া দুনিয়া করোনা নিয়ে খুব ভাবছে। লকডাউনের পরিস্থিতি খুব বেশী চালু হয়নি। তাইওয়ানে গিয়ে আরও বেশী করে পানি নিয়ে নিই। ১৩ই মার্চে দুই জন বার্মিজ ক্রু সাইন অফ করে তখনও বিমানে চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তাইওয়ানের শহরও মুখোসে মুখবন্দী। সামাজিক দুরত্বে মেনে সকল কাজ কর্ম করছে। তাইওয়ানের কোরান্টাইনের অফিসারের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম জিন সেং চা করোনা ভাইরাসের জন্য ভাল প্রতিষেধক” জাহাজে প্রচুর পরিমানে জিনসেং চা এজেন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে যে করোনার জন্য জিনসেং চা ভাল কাজ করে। পোর্টে থাকাকালীন জাহাজে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেছি। সঠিক পিপিই ছাড়া কাউকে জাহাজে অথবা শহরে যেতে দিইনি। প্রতিদিন প্রতিটির স্ক্রুর তাপমাত্র পরিমাপ করেছি। পোর্ট কর্তৃপক্ষের সকলকে সবকিছু নিশ্চিত করে জাহাজে উঠতে দিয়েছি।
পুরো জাহাজ চেতনানাশক কার্গো ক্লোরোফর্ম ও মিথানল নিয়ে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। তাইওয়ানের কাউসিয়াং এর প্রস্থানের পরে পুরো জাহাজ স্যানিটাইজেসন করেছিলাম। আসলে এসব কাজের কোন বিকল্প ছিল না।
১৫ই মার্চ সকাল দশটা, দক্ষিণ চীন সাগরকে ফালি ফালি করে জাহাজ চলছে। ঝলমলে আকাশ, শান্ত সমুদ্র, অনাবিল বাতাস আর চারিদিকে নীল ঢেউয়ে আচ্ছন্ন। পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে বয়ে যাচ্ছে নীরব কান্না। উপরওয়ালার এটা কি খেলা খেলছে? কেউ ভাবছে, কেউ কাদছে। কোম্পানি থেকে তারবার্তা পেলাম- “সারা দুনিয়া লকডাউন হয়ে গেছে, অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিমান চলাচল বন্ধ, মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারবে না।”
অধ্যাপক শানের কথা ভাবতেই খুব অস্বস্তি বোধ করছি। অনুবিজ্ঞানী অনুমান করে বলেছেন “পৃথিবী বন্ধ হয়ে যাবে”। শুধু ভাবছি “এসব বিজ্ঞানীদের হাতে পৃথিবী বন্দী” এরা যে ভাবে চায় সে ভাবেই খেলাতে চায়। তাইওয়ান থেকে মুম্বাইয়ের রাস্তা ১৬ দিনের। মুম্বাই থেকে করাচির রাস্তা ৩ দিনের। জাহাজে খাবার, পানি, জ্বালানী পর্যাপ্ত আছে। কিন্তু এক মাসের বেশী চালানো সম্ভব নয়। যাত্রা পথে খাবার ও পানির রেশনিং করার সিদ্ধান্ত নিই। যদি কোনো কারনে যে কোন পোর্টে খাবার ও পানি না পাওয়া যায়, এই আশংকাতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হই। অফিস থেকে জানিয়ে দিল ভারত ও পাকিস্তানে কোন খাবার পানি সরবরাহ করা সম্ভব নয়। ফলে খাবারের মেনু ছোট করেছি, প্রতিটি ক্রুকে ২০ লিটারের বেশি পানি বরাদ্দ ছিল না, জাহাজে করোনাকালীন কোন পার্টির আয়োজন করা হয়নি। এই রকম দূর্বীসহ জীবন অতিরিক্ত ৭-৮ দিন চালিয়ে যেতে হয়েছিল।
জাহাজ যখন ভারতে আসে, পুরো ভারত লকডাউনে ছিল। ০৩ এপ্রিল মুম্বাইতে পৌছে কার্গো খালাস করি। কোন রকম পিপিই নেই, করোনা নিয়ে ভারতীয়দের অনীহা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। যতক্ষন সঠিকভাবে পিপিই না পড়েছে ততক্ষন জাহাজে উঠতেই দিইনি। এই নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভাল হুলস্থুল করেছিল। করোনার আঘাত বেশী হয়েছে দক্ষিণ এশিয়াতে। এশিয়াকে করোনার হাব বলা হয়। এটার একমাত্র কারণ হল এশিয়ার লোকজনের তাচ্ছিল ও দায়িত্ববোধের বড়ই অভাব। পাকিস্থানে গিয়ে যা দেখেছি তা ভারতের চেয়ে কিছুটা ভাল ছিল। পার্থক্য করার মত কোন মোটা দাগ চোখে পড়েনি।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি মোটমুটি ৭-৮ দিনের পানি, খাবার ও জ্বালানীর সংকটে ভুগেছিলাম। পূর্বের ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে আমরা কয়েকদিনের সংকটে পড়েছি। যদি এই ব্যবস্থা না নেওয়া যেত তাহলে এই সংকট আরও দীর্ঘতর হতে পারত। ১৫ই এপ্রিল আরব আমিরাতের খোরপাক্কান থেকে খাবার পানি, জ্বালানীর সরবরাহ পাই। তবে এইবার আগামী ছয় মাসের খাবার, তিন মাসের পানি, ট্যাংক ভর্তি করে জ্বালানী নিই। এই পদক্ষেপে আমরা পরবর্তীতে ভাল কাজ দিয়েছিল।
খোরপাক্কান ছোট শহর হলেও সিমসাম ও পরিস্কার। ঝাঝালো তাপমাত্রায় সবকিছু ধূসর মনে হত। এই তাপমাত্রাতেও শ্রমিকদের কাজ করতে দেখেছি। শহরে রাস্তায় জ্যাম ছিল না, তবে গাড়ি ছুটতে দেখেছি তাদের ব্যস্ততার বহর নিয়ে। এই শহর ঠিক সন্ধার পর ভূতুরে শহর মনে হত। ১৪৪ ধারা জারীর কারনে কেউ লোকালয়ের বাহিরে আসতে পারত না। সারা রাত ধরে কর্তৃপক্ষ পুরো শহর স্যানিটাইজেসন নিয়ে ব্যস্ত থাকত বলে শুনেছি। সম্ভবত এই পদ্ধতি বেশী কার্যকরী বলে মোটামুটি বিশ্বের সকল শহর করোনা কালীন মেনে চলছে। খোরপাক্কান থেকে খাবার পানি, জ্বালানী নিয়ে সোজা বাসরা, ইরাকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই।
সাদ্দাম হোসেনের ইরাক এক ইতিহাসের স্বাক্ষী। ভগ্নদশা এ শহরের মানুষেরা করোনা কি এবং কিভাবে আঘাত করে জানতে চায় না। দূর্ণীতির মহার্ঘ আয়োজন ও ঘটা করে দূর্ণীতি করা যেন স্বাভাবিক কাজ। তাদের পিপিই ব্যবস্থা দেখে আমি আমার কেবিন থেকে খুব বেশী বের হইনি। জাহাজে উঠার পূর্বে করোনা নিয়ে সেফটি ব্রিফিং, পিপিই প্রদান, হাত স্যানিটাইজেসন করে জাহাজে উঠিয়েছি। একটু পর মাস্কটা নাকের পরিবর্তে মাথায় বন্দী হতে দেখেছি। জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসাবে প্রতিটি পোর্টে আমাকে জাহাজের ক্রু করোনা মুক্ত মুচলেকা দিয়ে পোর্টে ঢুকতে হয়েছে। পোর্টের কর্তৃপক্ষ বুঝতেই চায় না যে তুমি যে মুচলেখা নিয়ে জাহাজ পোর্টে নিয়ে আসলে, তোমার কারণে যদি আমার ক্রু যদি করোনায় আক্রান্ত হয়। বাসরা, ইরাক থেকে কার্গো নিয়ে সোজা মিশর হয়ে ইউরোপের মাল্টাতে পৌছে যায়।

মাল্টা ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র, খুবই সুন্দর শহর। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এই শহরের মানুষগুলো আরও সাদা মনের। করোনা নিয়ে তাদের ভাবনা অধ্যাপক শনের সাথে মিলে যায়। তাইতো ইউরোপের দেশগুলোকে সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে করে। মাল্টা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা অবিশ্বাস্য। এজেন্ট যখন জাহাজ এসেছে পুরোপুরি করোনাকালীন ড্রেসকোড মেনে জাহাজে উঠেছে। এজেন্টের একজোড়া তাজা গোলাপ ফুলের সতেজ গন্ধ নাকে এখনও লেগে আছে। দুই প্যাকেট তাজা মিষ্টির স্বাদ এখনও ভুলিনি। সভ্য নাগরিকের কলাকৌসল এরা পুরো রপ্ত করেছে। মাল্টার শহরগুলোতে সামারের আনন্দ আয়োজন চলছে। ঝলমলে সতেজ দিনে মাখা মাখা রোদে দিনভর ঘুরলেও ক্লান্তি কখনও ছুয়ে দেখবে না।
মাল্টার শহরগুলো মুখোশে বন্দী। কর্তৃপক্ষের তেমন সাড়া পেলাম না। গ্রীষ্মের আনন্দ আয়োজনে করোনার কারনে ভাটা পড়েছে তবে উৎসবের আমেজ চোখে পড়েছে। দলে দলে লোকের আনাগোনা চোখেই পড়েনি। করোনার কারনে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলেছে। কাষ্টম অফিসারের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম “যুবকদের কর্মক্ষেত্রে কোন বাধা ও নিয়মাবলী বলবৎ নেই। তাদের সরকার শুধু শিশু ও বয়স্কদের লোকালয়ে আসা নিষিদ্ধ করেছে। মৃত্যুর হার মাল্টাতে অনেকটাই কম। তবে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে কর্তৃপক্ষ জনগনকে সজাগ করেছে। তার ভাষ্যমতে এই ভাইরাস নতুন বলে শ্বেত রক্ত কনিকার স্ময়তিতে জমা নেই। ফলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোন ব্যক্তির শ্বেত কনিকা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। মাল্টার জনগণ মনে করে যে, হয় রোগ থেকে দুরে থাক নতুবা করোনাকে স্বাগত জানাও। এর মধ্যবর্তী স্থানের কোনো সুযোগ নেই।
সুন্দর মাল্টাকে বিদায় জানিয়ে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। গাদ্দাফীর সোনার টুকরো দেশটি গৃহযুদ্ধে ভগ্নদশা। জাতিসংঘের বিশেষ অনুমতিতে লিবিয়াতে পৌছি। লিবিয়াতে বিশেষ কোন কিছু চোখে পড়েনি। তবে আপামর জনতা ইসরাইলকে খুব ঘৃনা কর। লিবিয়ার টুবরোক শহর ছেড়ে যখন চলে আসছি এজেন্ট জানালো বেনগাজীতে ৩০জন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। হাফতার বাহিনী এ জঘন্য কাজ করেছে। টুবরাক পোর্টে থাকাকালীন বাহিরে যাওয়া হয়নি। বলা বাহুল্য টুবরোকে একজন বাংলাদেশীকে পেয়েছিলাম। গৃহযুদ্বের কারণে কর্মক্ষেত্র ও বসবাসের ঘরের বাহিরে বের হয়না। বাংলাদেশে টাকা পাঠানো খুবই সমস্যা, কোন ব্যাংক লেনদেন চলে না। ৬-৭ মাসে একবার টাকা পাঠাতে পারে। তবে এজেন্টের মাধ্যমে তার টাকা বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। এই দুরদেশ থেকে একজন বাংলাদেশীর জন্য কিছু করতে পেরেছি বলে খুব পুলকিত হয়েছিলাম।

লিবিয়া ছেড়ে সৌদি আরবের মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। আমার নবীজির দেশ। পূর্বে এই দেশে কখনো যাওয়া হয়নি। যদি সময় পাই তাহলে ওমরা করার ইচ্ছা পোষণ করি। কিন্তু মদিনাতে পৌছার একদিন আগে জাহাজ নিয়ে দুবাইতে যাওয়ার তারবার্তা পাই। ওমরা করার ইচ্ছা এখনও আছে। তবে উপরওয়ালা সব ফয়সালার মালিক। আমার বন্ধুবর ক্যাপ্টেন রাকিবের কাছ থেকে তারবার্তা পেলাম যে, তার সাইন অফ হচ্ছে না, এক বছরের বেশী জাহাজে অবস্থান করছে। ক্যাপ্টেনদের সর্বোচ্চ চার মাস জাহাজে থাকতে হয়। করোনাকালীন সব কিছু এলোমেলো হয়েছে। এই মুহুর্তে অধ্যাপক শনকে সামনে পেলে বলতাম “দেখুন এই পৃথিবী থেমে যায়নি, নিয়মের আদলে সবই চলেছে। নাবিকেরা জীবন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও করোনাকে জয় করেছে। দেশ থেকে দেশে ছুটে চলেছে, সকলের তরে রসদ সরবরাহ করেছে। লক্ষাধিক নাবিকেরা জাহাজে ভাসছে বছরের পর বছর। নাবিকের পরিবার স্বপ্ন বুনছে কখন তার প্রিয়জন দেশে ফিরে আসবে। সকলে ভাল থাকুক, মানবতার জয় হোক।

Loading...