দেশের বিপন্ন পাটশিল্প রক্ষা কর- বাচাঁও জীবন! অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান

0 9

একবিংশ শতাব্দীর বিশ^ায়ণের চলমান সময়ে বিশ^বাসী যখন জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারনে নানা রকম দূর্যোগে-দূর্ভোগে দিনাতিপাত করছে। আনবিক , পারমানবিক , রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের আতঙ্কের কারনে জননিরাপত্তা যখন চরম হুমকির মুখে। ঠিক সেই সময় শুরু হয়েছে কভিড-১৯ করোনার আক্রমণ। অদৃশ্য অশরীরি অতিসুক্ষ মাত্রার এ ভাইরাসের আকক্রমনের শিকার হয়ে বিশে^র সকল পরাশক্তি আজ পরাভূত। এযাবত প্রায় ৬ লাখ মানুষের জীবননাশ হয়েছে আর আক্রান্ত ১ কোটি ৪ লাখে পৌঁছেছে। এ মহামারিতে ঠিক কতজন মানুষের প্রাণ সংহার হবে তা ভবিষ্যৎ পরিস্তিতি বলে দিবে। বাংলাদেশে এ প্রবন্ধ লেখাঅব্দি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে প্রায় ২ হাজার আর আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দেড়লাখ। এমতাবস্থায় দেশের উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানির তোড়ে বিপন্ন জীবনের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে দেশের নদী মাতৃক জেলার লাখ লাখ নদীসিকস্তি মানুষ। সামগ্রিক পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে কর্মক্ষেত্র হ্রাস জনিত কারনে হু হু বেকারত্ম বাড়ছে ।

এহেন পরিস্থিতিতে বিশ^ায়নের চলমান প্রতিযোগিতায় পরিবেশবান্ধব পাটজাতদ্রব্য সামগ্রী তৈরির শিল্পকারখানাগুলোর গুরুত্ব অতিদ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে পাটের উৎপাদনের উপযুক্ত ক্ষেত্র বলে বিশে^ সুনাম অর্জনের জুড়ি নেই। বিগত কয়েক যুগে পাট উৎপাদন ও পাটজাতদ্রব্য সামগ্রি উৎপাদনে বাংলাদেশের পাট শীল্পের অবদান , সুনাম ও বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের রেকর্ড বিশ^ স¦ীকৃত। অথচ আজকের প্রেক্ষাপটে এ শিল্প চরমভাবে বিমাতা সূলভ আচরনের শিকার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর ১৯৭২ সালে এসব শিল্প কারখানাগুলো রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। আশাকরা হয়েছিল এসব শিল্পকারখানায় উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে যুদ্ধ-বিদ্ধস্থ একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকার গতি আরও বৃদ্ধি পাবে। কৃষকরা পাট উৎপাদন করে ন্যায্য দামে বিক্রি করে তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাবে। শ্রমিকরা তাদের শ্রম বিনিয়োগ করে মেহনতের বিনিময়ে অর্জিত রুজিতে তাদের প্রয়োজনীয় চহিদা মেটাতে সক্ষম হবে এবং শ্রমিক-কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। কিন্তু যুগের বিবর্তনে সে আশার মৃত্যুঘন্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাষ্ট্রয়ত্ব শিল্পকারখানাগুলোতে প্রশাসনিক অদক্ষতা , অব্যবস্থাপনা , দেশপ্রেমের পরিবর্তে দূর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি এবং অপ্রয়োজনীয় অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি কারনে খুব কম সময়ের ব্যবধানে অলাভজনক শিল্পকারখানায় পরিণত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ কারখানাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার অর্থনৈতিক শিল্পবিপ্লব মুখ থুবড়ে পড়ে।

পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকার কর্তৃক দেশের শিল্পকে বাচাঁনোর তাগিদে জাতীয় করণকৃত অধিকাংশ কলকারখানা সমূহ বেসরকারি করনের মাধ্যমে চালু রাখার যে চেষ্ঠা করা হয় তাতে নাম মাত্র মূল্যে হস্থান্তর করে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানার আওতায় দেওয়া হয়। অদক্ষ এসব নতুন স্বার্থবাদী মিল মালিকরা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ব পাকিস্তানে তিলে তিলে গড়ে উঠে ব্যক্তি মালিকানাধীন লাভ জনক বিভিন্ন শিল্পকারখানাধ্বংশের দারপ্রান্তে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে । অধিক মুনাফার নামে সরকার ঘোষিত ঋণসুবিধা আমদানি সুযোগের অপব্যবহার কারখানার স্থায়ী-অস্থায়ী মূল্যবান সম্পদ বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রচুর ফায়দা লাভ করে দেশের শ্রমবাজার ধ্বংস করে শিল্প বিকাশের পথ তিলে তিলে বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ চলমান সময়ে দেশের ২৬ টি পাটকল একযোগে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত মূলত পূর্বেকার চলমান অশুভ পরিণতির পূণরাবৃত্তি এবং ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন পাট শিল্পের সাথে জড়িত ভুক্তভোগী শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা মনে করেন জনসার্থবিরোধী এবং ভিনদেশীদের স্বার্থ রক্ষার এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের জন্য কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনা। এ শিল্পকে বাচাঁতে কখনো সরকারী , কখনো বেসরকারি , কখনো ব্যক্তি মালিকানাধীন এর আওতায় পরিচালিত হয় , কিন্তু কোন পদক্ষেপই সফলতার মুখ দেখতে পারেনি। এসব কলকারখানার পরিচালিত দায়িত্ব যাদের উপর অর্পিত হয়েছে তারা অধিকাংশই কয়েমী স্বার্থবাদী। এদের হাতে কোন সময়ই এসব ভারি মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্প অদৌ নিরাপদ ছিলনা। বিগত ৫০ বছর এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন , উন্নতি-অবনতির প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ , বিচার -বিশ্লেষণ করলে এসবের আসল চিত্র জাতির সামনে উম্মোচিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। হাতবদলের ডামাডোলে সকলেই যে পরিমাণ চেটেপুটে খেয়েছে তাতে করে এ শিল্প এখন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এ শিল্প এখন মৃতপ্রায়। এমতাবস্থায় দেশের রাষ্ট্রয়ত্ব পাটকলগুলো পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর মাধ্যমে পরিচালনার অর্থাৎ রাষ্ট্র ও ব্যক্তি খাতের যৌথ উদ্যোগে পরিচালনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। এতে করে ৪৯ বছরের মাথায় এসে দেশের পাট কল গুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাচ্যুৎ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে চলেছে। অর্থাৎ পাট শিল্পের পুরো সেক্টর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

এ শিল্পই শুধু নয় দেশের সকল সম্ভবনাময় শিল্পকে বিশেষ করে বস্ত্র , চা , চামড়া , চিনি , মৎস্য এবং পাটশিল্প কারখানাগুলো বাচাঁতে অযোগ্য-অসৎ ও সার্থবাদীদের হাতে হস্থান্তর না করে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সৎ যোগ্য অভিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে হস্থান্তরের বিকল্প নেই। সেই সাথে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার , উৎপাদন বৃদ্ধি , পণ্যের গুনগত মান নিয়ন্ত্রণ , রপ্তানি বৃদ্ধি ও সকল সেক্টরে দূর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে। তবেই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় অদম্য বাংলাদেশ কথাটি স্বার্থক হবে।
বর্তমানে দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। জন সম্পদের ক্ষতি সাধন হচ্ছে। জননিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি চিন্তা করে ব্যক্তি মালিকানা ও সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো , শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষিত হওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে কয়েক কোটি মানুষ। মরার উপর খড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভয়াবহ বন্যা। হু হু করে বেকারত্বের ন্যায় বাড়ছে নদ-নদীর বন্যার পানি । বসত বাড়ি , ফসলি জমি , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সহ মাঠ-ঘাট , সড়ক ও জনপথ একের পর এক তলিয়ে যাচ্ছে এবং নদী ভাঙ্গণের শিকার হয়ে বন্যা কবলিত লাখ লাখ মানুষ ও গবাদি পশু-পাখি দূর্যোগ-দূর্ভোগে শিকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
দেশের ক্লাšিত লগ্নে দেশের রাষ্ট্রীয় শিল্প সম্পদগুলো হাতছাড়া করা এবং ২৫ হাজার শ্রমিককে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যায় নির্বাহের বিনিময়ে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদায় করার পরিকল্পনা দেশে কি কর্মক্ষম শ্রমিকের হাত বেকার হয়ে পরছেনা ? এসব বিষয়ে দেশের পাটককল শ্রমিক সহ ট্রেড ইউনিয়ন , শ্রমিক ফেডারেশন বা এ ধরনের শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হঠাৎ করে দেশের ২৫ টি পাটকল একযোগে বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছেন। সেই সাথে দেশের মানবাধিকার সংগঠন , রাজনৈতিক দল , সচেতন নাগরিক , অভিজ্ঞ মহল , শিল্পকারখানা বিশ্লেষক , অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিজীবিরা নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। তারা দেশের গার্মেন্সশিল্প , চামড়া শিল্প , মৎস্য শিল্প , চিনি শিল্প , চা শিল্প , মৃৎশিল্প , হস্ত শিল্প সহ ছোট বড় মাঝারি সব ধরনের শিল্পকারখানাকে পূর্বের ন্যায় চালূকরণ ও লাভ জনক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরিত করার দাবি জানান। তারা ৫১ হাজার শ্রমিকের চাকরিচ্যুত করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। নেতৃবৃন্দ সরকারকে পাট খাতে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা লোকসান দেওয়ার অজুহাতে ২৫ টি রাষ্ট্রয়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্বান্ত বাতিলের দাবি জানান । পাট খাতে যে লোকসান হয়েছে তার জন্য প্রশাসনের অদক্ষতা অযোগ্যতা , দূর্নীতিই মূলত দায়ী, যে কারনে এশিয়া মহাদেশের বিখ্যাত আদমজী জুটমিল সহ দেশের নদী মাতৃক জেলায় স্থাপিত ও পরিচালিত অর্ধসহ¯্রাধিক পাটশিল্প কারখানা লোকসানের মুখে বন্ধ করে দেওয়া হয় । এর জন্য কোন ভাবেই শ্রমিকরা দায়ী নয় । অথচ ব্যর্থতার সেই মূল্য অতীতে যেমন শ্রমিকদের দিতে হয়েছে আজও দিতে হচ্ছে সেই মেহনতি শ্রমিকদের।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে পাটকলগুলো পরবর্তী সময়ে সরকারী-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় চলবে। এক্ষেত্রে অতীত সরকারের বিগত রেকর্ড থেকে এটি আশংকা করা যেতে পারে যে আবারও এসব সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় নামমাত্র মূল্যে অংশীদারিত্ব করার নামে দেশের পাট শিল্পকে ধ্বংস করে শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে ভিনদেশী রাষ্ট্রের সুবিধাভোগীদের স্বার্থ তথা পশ্চিম বাংলার অচল পাটকলকারখানাগুলো চালু করার নীল নকশা বস্তবায়ণে সরকারের অভ্যন্তরের ঘাপটি মেরে থাকা কোন একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল নিরবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশেষ ফায়দা লুফে নিচ্ছেনাতো?

লেখকঃ জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক সাংবাদিক গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

Loading...