কোভিড-১৯: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবী ও বাংলাদেশ

0 10

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর গত ৩০ মার্চ করোনার সময়কার অর্থনীতি ও করণীয় নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। এরপর সাড়ে তিন মাসেও করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়নি। তবে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন আবিষ্কার অনেকটা এগিয়েছে। মানুষের শরীরে দ্বিতীয় দফা প্রয়োগের ফলাফলে সোমবার এই ভ্যাকসিন নিরাপদ বলা হয়েছে। এটা অনেক আশার খবর। তৃতীয় দফায় মানুষের শরীরে পরীক্ষা করার পর এটিকে কার্যকর ঘোষণা করা হতে পারে। তবে সময় লাগবে। আর আগামী অক্টোবরের দিকে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও সেটি বিশ্বের ৮০০ কোটি মানুষের পাওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
এদিকে, যেসব দেশ সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন করেনি, সেসব দেশে নভেল করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই আগামীদিনে বিশ্বের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনার আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিশ্বের পরাশক্তির উত্থান ও পতনের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।
যুগে যুগে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে নতুন শক্তির উত্থান ও পুরনো শক্তির পতন হয়েছে। শুধু তাই নয়, নতুন মেরুকরণও হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে ফ্রান্সের অংশগ্রহণের জন্য দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হয়। বেকারত্বের সংখ্যা বাড়তে থাকে। যার ফলে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং ফ্রান্স বিপ্লবের (ফ্রেন্স রিভ্যুলেশন) মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন হওয়ায় দেশটি ফ্রেন্স রিপাবলিক (গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র) রাষ্ট্রে পরিণত হয়। জারের দুঃশাসনে রাশিয়ায় অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হয়। মানুষ ব্যাপকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে রক্তাক্ত অধ্যায়ের মাধ্যমে রাশিয়ায় বলশেভিকের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা হয়।
অন্যদিকে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক অর্থ ও প্রাণহানির ফলে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অস্ত্র যোগানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা, ব্যাপক কর্মহানি ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার ফলে বিভিন্ন দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকারের উত্থান ঘটে। এর মধ্যে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাজি পার্টি, ইতালিতে মুসোলিনি, স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কো এবং জাপানে জেনারেল তোজোর মতো ব্যক্তিরা ক্ষমতায় আসেন। প্রায় সাড়ে আট কোটি লোকের জীবনের বিনিময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে, অবসান হয় যুক্তরাজ্যের একক আধিপত্য। একে একে মুক্ত হতে থাকে যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন কলোনিগুলো। এর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান অন্যতম। শুধু তাই নয়, যুক্তরাজ্যের পরিবর্তে বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে উত্থান হয় আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বেশ কিছু স্বাধীনতাকামী জাতীয়তাবাদী নেতার সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভিয়েতনামের হো চি মিন, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, উত্তর কোরিয়ায় কিম উল সং, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভারতের জওহরলাল নেহরু ও মহাত্মা গান্ধী, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো, কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা, জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে স্বাধীনতাকামী জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে আবর্তিত হন এবং দুই পরাশক্তির বাইরে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সৃষ্টিতে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। যাদের আবার কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে একনায়ক হয়ে যান।
তবে এসব অধিকাংশ দেশই স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সমর্থ হয়। সম্ভবত যুদ্ধের অপকারিতা বা ক্ষয়ক্ষতি সমন্ধে তৎকালীন নেতাদের উপলব্ধি এবং দুই পরাশক্তির ভারসাম্য এর অন্যতম কারণ। এরই ধারাবাহিকতায় জার্মানি থেকে জাপান, হংকং থেকে সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর প্রভূত অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এর ফলে দুই পরাশক্তির বাইরে একটি অন্যতম জোটনিরেপেক্ষ হিসেবে এসব দেশের নেতৃত্ব বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।

এদিকে, ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক ও সামরিকসহ বিভিন্ন কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পর আমেরিকা একক পরাশক্তি হিসেবে ভূ-রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়। ভালোই চলছিল, বাধ সাধলেন আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন। ৯/১১ হামলা তথা আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর মধ্যে মুসলিমবিরোধী মনোভাবের উত্থান হয়। তার সঙ্গে যোগ হয় অভিবাসনবিরোধী মনোভাব। এসব কারণে ইউরোপ ও আমেরিকায় উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। যার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া ও আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো উগ্র মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীন হতে থাকেন। ফলে সমাজে উগ্র জাতীয়তাবাদ মনোভাবাপন্ন মানুষরা সক্রিয়া হয়ে ওঠেন এবং গণতান্ত্রিক ও সহমর্মিতাবোধসম্পন্ন শ্রেণির মানুষরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। শুধু তাই নয়, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রেরও উদ্ভব হতে থাকে। যেমনঃ রাশিয়া, ফিলিপাইন, সৌদি আরব, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া, ভেনিজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হলো, পৃথিবীতে মানবিক নেতৃত্বগুণাবলি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার অভাব।
আর এই যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে করোনা আসার আগে থেকেই ২০০৮ সালে পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হয়েছিল, কর্মহীন হয়ে পড়েছিল লাখ লাখ মানুষ। ২০১৫ সালের সেপ্টম্বর মাসে ইউরোপে শরণার্থী সংকটের সময় সিরিয়া থেকে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার পথে ভূ-মধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে সিরিয়ার পাঁচ বছরের শিশু আয়লান কুর্দির নিথর দেহ উপুড় হয়ে পড়ে ছিল সাগরতটে, যা বিশ্বের শত কোটি মানুষের মনে নাড়া দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্ব নেতৃত্বের মনে নাড়া দেয়নি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ক্ষমতায় আসার পরেই বিভিন্ন চুক্তি বাতিলসহ চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে লিপ্ত হন এবং অর্থনৈতিক মন্দার দিকে বিশ্ব চলে যেতে থাকে। এর মধ্যে যুক্ত হয় চীনের উহান থেকে উৎপত্তি করোনা ভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হওয়ার পর থেকে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং ছয় লাখ ২১ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন। তবে আশার কথা হলো, মানুষ এই করোনার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করেছে। এতে করে বিশ্বে করোনা আক্রান্তের হার প্রতিদিনই রেকর্ড ছাড়াচ্ছে।
এদিকে করোনার কারণে বিশ্বের অথনৈতিক অবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশসহ রপ্তানিমুখী দেশগুলো অর্থনৈতিক হুমকির মুখে পড়েছে। গত মার্চ মাস থেকে রপ্তানি কমতে শুরু করেছে। তবে জুলাই মাস থেকে কিছুটা বাড়লেও আগের অবস্থানে কবে যাবে সেটা বলা মুশিকল। বিশ্ব এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
আমরা যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল পাঁচ বিলিয়ন ডলার। দেশের ৪২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। আর মানুষের গড় মাথাপিছু আয় ছিল ৭০০ ডলারের একটু বেশি।
২০১৯ সালে সব মিলিয়ে রপ্তানি (পণ্য ও সার্ভিস) আয় তিনগুণ বেড়ে ৪৭ বিলিয়নে দাঁড়ায়। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাত গুণের বেশি বেড়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলার হয়। একইসঙ্গে দারিদ্র্যের হার অর্ধেক কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ২০০৯ সালে ছিল সাড়ে ৫ শতাংশ, আর ২০১৯ সালে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশ। যা বিশ্বে একটি অনুকরণীয় অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়। সারা বিশ্বের নজর পড়ে আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরি কিসিঞ্জারের তাচ্ছিল্যের আখ্যা তথাকথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এই সবুজ ব-দ্বীপের দিকে। তবে হেনরি কিসিঞ্জার এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখে নিশ্চয়ই লজ্জা পাচ্ছেন। কারণ তার মন্তব্য সঠিক হয়নি।
বর্তমানে চীনের সঙ্গে আমেরিকার প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে চীনের বিশ্বাসের ঘাটতি এবং ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চীনের প্রযুক্তি, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বিরাট বাজার রয়েছে। চীন এসব বাজার আগামীদিনে ধরে রাখতে পারবে কি-না, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাই বাংলাদেশ এসব বাজার কিছুটা ধরতে পারলেও অনেকটা এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে এবং আরও কিছু বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা হাতে নিয়ে দ্রুত কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সব থেকে সুবিধার একটি বড় বিষয় হলো, আমরা শতভাগ মানুষ চিন্তায় ও মননে বাঙালি। পোশাক থেকে খাদ্য, ভাষা থেকে চিন্তা-চেতনা সবই এক। এদেশের মানুষ ধর্মভিরু, কিন্তু তারা ধর্মান্ধ না। যার ফলে দেখা যায়, এখানে মানুষ ঈদে যেমন মুসলমানরা এবং দুর্গাপূজায় হিন্দুরা যার যার ধর্ম পালন করেন, তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতি পহেলা বৈশাখ দেশের আপামর মানুষ একসঙ্গে পালন করেন। এ যেন এক হরিহর আত্মা। এটাই এই জাতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের সবাই বাংলাদেশি। কিন্তু বিশ্বের সব দেশে এমন বৈশিষ্ট্য পাওয়া দুষ্কর। শুধু রাজনৈতিক ঐক্য অটুট থাকলে আমাদের আর ঠেকায় কে?
অথচ আমাদের পাশ্ববর্তী বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, ধর্ম, বর্ণ, কাষ্ট ও ভৌগোলিক কারণে অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও বাংলাদেশের মতো সামগ্রিক উন্নতি সাধন করতে পারছে না। তেমনি আমেরিকায় বর্তমানে সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। সেখানে ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার জন্য সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। দিন দিন তারা মূল ধারার উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক তথা সামাজিক উন্নয়নের জন্য ঐক্যের একান্ত প্রয়োজন । আবার ইউরোপ ও জাপানে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কাঙ্খিত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি হার বৃদ্ধি হচ্ছে না।
অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়ায় কর্তৃত্ববাদী সরকার এবং ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী সম্পন্ন ব্যক্তি বা সরকার ক্ষমতায় আসার ফলে বিশ্বে যেমন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিন দিন কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত হবে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলমত, জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি উন্নয়নের নীতিমালা তৈরি করা। যার মধ্যে নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
১. খাদ্য নিরাপত্তা ধরে রাখার জন্য কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা। কৃষকরা যাতে স্বল্প মূল্যে কৃষি উপকরণ পায় এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করণের ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা। যেমন: সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় গুদাম, শষ্য বীমা, নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ ও কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা।
২. জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিল্পায়ন, যোগাযোগ, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে সমাজের বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে কঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য এখনই দ্রুতগতিতে কাজ শুরু করা।
বাংলাদেশের আয়তন এক লাখ ৫৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। অনেকের মতে, এই ক্ষুদ্র দেশে ১৭ কোটি লোকের বাস একটি অকল্পনীয় বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই অল্প আয়তনের দেশটিতে এতো লোকের পরেও এখন আর কোনো দুর্ভিক্ষ নেই এবং বেকারত্বের হারও অন্য যেকোনো সময়ের থেকে কম।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা আফ্রিকার নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের থেকে অনেক কম। এটি আমাদের জন্য একটি অশনি সংকেত। এক সময় জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা অনেক সক্রিয় ছিলাম। কিন্তু এখন সময় এসেছে সামর্থ্য অনুযায়ী জন্মাহার বাড়ানো। যাদের সামর্থ্য বেশি তারা বেশি করে সন্তান নেবেন। কারণ আমাদের জন্মবৃদ্ধির হার এখন ০.৯৮ শতাংশ, যা ২০৫০ সালে আমাদের জনসংখ্যা মাইনাসের দিকে যাবে। আমাদের জন্মহার ১.৯৮ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে। এখন জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে আমাদের অবস্থান অষ্টম। ২১০০ সালে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে আমাদের অবস্থান হবে ২৫তম। মানুষই আমাদের সম্পদ। একটা সময় জনসংখ্যা সংকটে পড়বে অনেক দেশ। আজকের কোভিড-১৯ পরিপ্রেক্ষিত একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভবিষ্যতে যদি বিশ্বে এমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের উদ্ভব হয়, যেখানে হয়তো কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। সেটিকে মাথায় রেখে আমাদের জন্মহার বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করতে হবে। আর এজন্য কারিগরি শিক্ষা বাড়াতে হবে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যেকোনো বয়সের মানুষ কারিগরি শিক্ষা নিতে পারবে। এটা অনেক ভালো একটি উদ্যোগ।
তবে বাংলাদেশের যুব সমাজকে তিন মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে করে যুবসমাজ মাদকাসক্ত হবে না এবং শৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হবে। বিএনসিসি, গার্লস গাইডসহ বিভিন্নভাবে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশের যুবসমাজকে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আরেকটি বিষয় জরুরি, সেটা হলো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে কাজে লাগানো। সরকারের হাতে সবকিছু থাকলে হবে না। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে এবং বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার শুধু তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবে। যেমনঃ ৬৪ জেলা সদরের একটি স্কুলকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। সরকারের নিয়মানুযায়ী বেসরকারি কোম্পানিগুলো এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানোর সুযোগ পাবে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেও স্কুল-কলেজগুলো পরিচালনা করা যেতে পারে। আর শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য এক্সট্রা কারিকুলামের দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিটি স্কুলে ছবি আঁকা শেখানো, অভিনয় শেখানো, শারীরিক চর্চা, খেলাধুলা, সাঁতার, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিজীবনে বিভিন্ন সদাচরণ যেমনঃ রাস্তা চলাচল, ট্রাফিক সিগন্যাল কীভাবে মানতে হয়, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার, প্রাথমিক চিকিৎসার কৌশল, জরুরি সেবায় ফোন করে সমন্বয় করা, দুর্যোগকালীন স্বেচ্ছাশ্রম দেওয়া, আধুনিক শৌচাগার ব্যবহার, মেয়েদের ঋতুকালীন সময়ে পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সাবলীল কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি শেখানো, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, দূরশিক্ষার প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার শিক্ষা, মানসিক নিয়ন্ত্রণ, আরবি, চীনা, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দিতে হবে। শুধু তাই নয়, ধরনীকে রক্ষা করতে হলে পরিবশের উপর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে হবে। এসব বিষয়ে সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে শিক্ষকদের, যারা শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষা দিতে পারবেন। বার্ষিক শিক্ষাসফর বাধ্যতামূলক করতে হবে। সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি যেমনঃ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (মেম্বার, চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য), স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা (ইউএনও, কৃষি কর্মকর্তা, ওসি) ও জাতীয় পর্যায়ের রোল মডেল হিসেবে খ্যাত যেমনঃ বিখ্যাত জনপ্রিয় লেখক-লেখিকা, গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকা, ক্রীড়াবিদ, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত হয়ে তাদের চরিত্র গঠন ও নিজেদের উন্নয়নে উৎসাহ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্যারিয়ার কাউন্সিলর ঠিক করে দেবে একজন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশে প্রায় ছয় কোটি শিক্ষার্থী আছে। তাদের যদি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা যায় তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত হবে।

সরকার ইতোমধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এখানে জমির মালিকানা নিয়ে এবং ব্যাংকে মটগেজ করার ব্যবস্থা না থাকার জন্য এরকম একটি কার্যকর উদ্যোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে জমির মালিকানা না থাকলে, ব্যাংক অথবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করতে চায় না, তেমনি অন্যের জমিতে শিল্প করে জমির মালিকানা না পেলে দেশীয় উদ্যোক্তারা শিল্প করতে আগ্রহী হন না। এই ক্ষেত্রে শিল্প উদ্যোক্তাদের হয় অর্থের বিনিময়ে জমির মালিকানা (ফ্রি হোল্ড) অথবা দীর্ঘকালীন লিজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমনঃ বিসিকের জমি, তেজগাঁও শিল্প এলাকার জমি, রাজউকের জমি যেখানে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে করে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (দেশে-বিদেশে) ঋণ দিতে উৎসাহী হবে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের শিল্পগুলোকে মূলত উত্তরবঙ্গে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু পোশাক খাতের শ্রমিকরা মূলত উত্তরবঙ্গের। এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বন্দর থেকে কারখানার দূরত্ব কম হওয়ায় রপ্তানিতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে না। বাংলাদেশের বড় বড় বেসকারি শিল্প গ্রুপগুলোকে উত্তরবঙ্গসহ পিছিয়ে পড়া এলাকায় শিল্প স্থাপন করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাতে উন্নয়নের সুষম বণ্টন প্রতিপালন হবে।

সড়ক ও যানবাহনের পাশাপাশি বাংলাদেশে রেলওয়ের পণ্যবাহী ট্রেনগুলোকে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে প্রতিযোগিতামূলক খরচে পণ্য আনা-নেওয়া করতে পারবে। তাছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশের বিমানবন্দর, নদীবন্দর, সমুদ্রবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সেবার মান উন্নয়ন হবে। সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ডাক বিভাগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুপেয় পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে করে দেশের সরকারি, বেসরকারি সেবার মান উন্নত হবে এবং ভোক্তারা উপকৃত হবে। বাংলাদেশে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে সরকারি হাসপাতাল বেসরকারি পর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়ে সেবার মান বাড়ানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বমানের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যালেন্সশিট ও রেটিংয়ের ব্যবস্থা করে দেশি-বিদেশি স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে যেমন বাণিজ্যিক ব্যাংক হতে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমে যাবে, তেমনিভাবে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে দেশি-বিদেশি অর্থের প্রবেশ ঘটবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে যেমনঃ সড়ক, সেতু, বন্দর, নদী খনন ও নদীশাসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সেচ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন অবকাঠামো সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।
সমালোচকরা উপরের ব্যবস্থাগুলোকে বিগত দিনের আলোকে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি দাঁড় করাবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দিনের শেষে আমাদেরকে সরকার ও জনগণের ওপর বিশ্বাস রাখতেই হবে। তা না হলে এখনো পর্যন্ত রেলওয়ের চালক দেরিতে হলেও গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে, বিমান এখনো পর্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে যাত্রী পরিবহন করছে। এখনো মানুষ ব্যাংকে টাকা রেখে ফেরত পাচ্ছেন। এখনো শিল্প উদ্যোক্তরা শিল্প গড়ে কর্মসংস্থান করে টাকা ফেরত দিচ্ছেন। শিক্ষকরা শিক্ষা দিয়ে দেশের শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ করেছেন। রাজনীতিবীদরা আমলা ও ব্যবসায়ীদের দিয়ে দেশের শিল্পায়ন করে ১০ শতাংশের বেশি শিল্পায়নের প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছেন। কৃষকরা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সহযোগিতায় দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া দেশে-বিদেশে তথ্যের অবাধ সরবরাহ করছে। এইভাবেই তো, কিসিঞ্জারের তলাবিহীন ঝুড়ি পৃথিবীতে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এটা কারও দয়ার দেওয়া নয়। উপরের পদ্ধতিগুলোর বাস্তাবায়ন ও ফল পাওয়া যাবে মূলত ‘সুশাসনের মাধ্যমে’। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Loading...