কচু বাম্পার ফলন চাষ করে হাঁসছেন কুষ্টিয়ার কৃষকরা

0 65

শাহীন আলম লিটন কুষ্টিয়া  ।।  করোনার কারণে সবজি চাষীরা কিছু চিন্তিত থাকলেও আগাম জাতের কচু চাষ করে হাসছেন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার কৃষকরা। এবার কচুর দাম বেশ ভালো। বছর বর্ষার প্রকোপ বেশি থাকায় কচুর সেচ খরচও কম হয়েছে চাষীদের। যেখানে দুদিনে একবার সেচ আর প্রতি সেচেই সার দিতে হয় সেখান এবছর খরচও কম হয়েছে। রোগ ও পোকাও তুলনামুলক কম। আবার বিঘা প্রতি ১০০-১২০ মন প্রতি বিঘায় কচুও পাচ্ছেন কৃষক। কৃষকরা স্থানীয় বাজারেই দর পাচ্ছেন কেজি প্রতি ৫০-৬০ টাকা। সবজি হিসাবে বাজারে চাহিদা বেশি থাকা এবং কচুর ফল ভালো হওয়ায় বৃদ্ধি পেয়েছে কচুর চাষ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি (২০২০-২১) খরিপ-১ মৌসুমে জেলায় ১ হাজার ১৪ হেক্টর জমিতে কচুর আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া সদরে ১৮০ হেক্টর, খোকসায় ৪০ হেক্টর, কুমারখালীতে ৭২ হেক্টর, মিরপুরে ১৭০ হেক্টর, ভেড়ামারায় ১৪৫ হেক্টর, দৌলতপুরে ৪০৭ হেক্টর। গত বছরে আবাদ হয়েছো ৭৫৯ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিলো ১৯ হাজার ৩শ ২৭ মেট্রিক টন। যার হেক্টর প্রতি গড় ফলন ২৫ দশমিক ৪৬ মেট্রিকটন। এবছর কচুর ফলন বেশ ভালো। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপর ইউনিয়নের কাতলামারী এলাকার কৃষক রাজা মিয়া। তিনি এবছর ১০ কাঁঠা জমিতে আগাম জাতের কচুর চাষ করেছেন। খরচও তুলনামুলক কম হয়েছে।

রাজা মিয়া জানান, “আমি ১০ কাঠা জমিতে কচুর চাষ করেছি। এক কাঠা জমি থেকে আমি ৫-৬ মন করে কচু পাচ্ছি। জমি থেকেই আমি ৫৫ টাকা কেজি দরে পাইকারী বিক্রি করে দিচ্ছি।”
তিনি বলেন, “প্রতিবার তো এমন দাম হয় না, এবার কচুর দাম খুবই ভালো। যদি এমন বাজার থাকে তাহলে কচুতে প্রচুর পয়সা হবে কৃষকের।”
একই এলাকার কচু চাষী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “কচুতে যত সার দেওয়া হয় তা অন্য কোন ফসলে আমরা দেয়না। তাছাড়া এক দিন পর পর কচুর জমিতে সেচ দিতে হয়। হাতি পোষা আর কচু চাষ সমান। কিন্তু এবছর বৃষ্টির কারণে কচুতে বেশি সেচ লাগেনি। তারপরেও ভালোই সেচ দিতে হচ্ছে। বৃষ্টি না হলে ৩/৪ দিনে একবার সেচ আর সার দিতে হচ্ছে।” তিনি বলেন, “আমি ১৫ কাঁঠা জমিতে এবার হাইব্রিড মুখিকচুর চাষ করেছি। গত বছর আমি ১০ কাঁঠা জমিতে কচুর চাষ করেছিলাম। কাঁঠা প্রতি ৬মন করে কচু পেয়েছিলাম। গত বছর ৩০-৩২ টাকা দরে কচু বিক্রি করেছিলাম। এবার তো কচুর দাম বেশ ভালো।”
আরেকচাষী আনোয়ারুল ইসলাম জানান, “পৌঁষ মাসের শুরুতে জমিতে বীজ রোপন করেছি। মাঘ মাসে কচু বের হয়েছে। এক বিঘা জমিতে ৪মন করে কচুর বীজ লাগে। মনপ্রতি বীজ ৩ হাজার টাকা। এছাড়া জমি চাষ, সার দেওয়া, সেচ দেওয়া, কচুর গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া, নিড়ানী খরচ ভালোই হয়। দুই দিন পর পর সেচ না দিলে মাটি শুকিয়ে যায়। এতে কচু ভালো হয় না। আর প্রতিবার সেচ দেওয়ার পর সার দিতে হয়। এবার কচুর জমিতে সেচ কমই লেগেছে। কারণ বৃষ্টি হয় মাঝে মাঝেই।”
তিনি বলেন, “মাঠ থেকেই কচুর যে দাম এটা যদি আর দুই একমাস থাকে তাহলে কৃষকরা লাভবান হবে।”
আরব আলী নামের এক কচু চাষী জানান, “এবার কচুতে জৈব সার ব্যবহার করে গাছ বেশ ভালো হয়েছে। কচুও গাছে বেশ ভালো হয়েছে। দাম ভালো থাকলে আশা করছি লাভ হবে।”
তিনি আরো বলেন, “কচুতে এবার কোল মুখিও বেশি রয়েছে। মুল গাছের সাথে সাথে ঐ কোল মুখিতেও কচু হয়েছে। কুষ্টিয়ার সবচেয়ে কচু চাষ বেশি হওয় দৌলতপুর উপজেলায়। দৌলতপুর উপজেলার খলিসাকুন্ডি ইউনিয়নের মালিপাড়া এলাকার কৃষক সোহেল রানা জানান, “আমি একবিঘা জমিতে কচুর চাষ করেছি। তবে একটু নাবী। এখন মাত্র গুটি গুটি হয়েছে। এক মাস পরে কচু তুলতে পারবো। আগাম জামের কচুটায় লাভ বেশি। কারণ এ সময় দাম ভালো হয়।” এছাড়া মাঠ থেকে কচু তুলে এনে বাড়ীতে পরিষ্কার করেও টাকা পাচ্ছেন কৃষাণীরা। প্রতিমন কচু পরীস্কার করে দিলে তারা পায় ২৫-৩০ টাকা। একজন মহিলা ঘন্টায় দেড়-দুই মন কচু পরীস্কার করে থাকে।
জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারী কাঁচা বাজারের ব্যবসায়ী জিনারুল আলী জানান, “কচুর বর্তমান বাজার দর পায়কারী ৪৫-৫০ টাকা কেজি। আমরা ৪০-৪৫ টাকা কেজি কিনছি। খুচরা পর্যায়ে বাজারে ৫০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।”
মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, “এই অঞ্চলের মাটি কচু চাষের জন্য উপযোগি। আর কচুচাষ বেশ লাভজনক। আগাম কচু চাষ করলে, বাজার দর ভালো পাওয়া যায়। সেই সাথে সবজি হিসাবে কচুর চাহিদা অনেক বেশি।”
তিনি আরো বলেন, “এবছর কচুর রোগবলাই কম। তাছাড়া বৃষ্টির কারণে কচুর সেচ খরচও কম লাগছে। আমরা কচুর আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি। এবছর কচুর দাম ভালো, এমন দুই এক মাস দাম থাকলে কৃষকরা ভালো লাভবান হবে।” জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক রঞ্জন কুমার প্রামানিক জানান, “কচু চাষ খুবই লাভজনক। কৃষকরা কচু চাষ করে বেশ ভালো লাভ করছেন। সেই সাথে দিন দিন কচু চাষ এই অঞ্চলে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কচুতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন ও পুষ্টি থাকে। মুখিকচুর পাশাপাশি লতিরাজ কচু চাষ করেও কৃষকরা কম সময়ে লাভবান হচ্ছেন।

Loading...